পাস বাড়লেও শিক্ষার মান নিয়ে ফের প্রশ্ন
বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ৩:০৪:৫৪ অপরাহ্ন

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হওয়া এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী পাস করেছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি মিলিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, সব সূচকই ঊর্ধ্বমুখী। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা, জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা, শতভাগ পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবই বেড়েছে। তবে বরাবরের মতো করে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাসের হার বাড়ছে, সমানতা’লে শিক্ষার মান বাড়ছে তো?
শিক্ষাবিদরা বলছেন, দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ হলেও শিক্ষার গুণগত মানের দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ হচ্ছে না শিক্ষা খাতে। কর্মমুখী শিক্ষাকে জো’র দিয়ে পাঠ্যক্রমকে ঢেলে সাজানোর পরাম’র্শ দিচ্ছেন তারা। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা ছাড়া শিক্ষার আসলে কোনো অর্থ নেই। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দিকটি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার জন্য যুগোপযোগী নীতি এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা বলছেন, তিন কারণে এবার উচ্চ মাধ্যমিকের পাসের হার বেড়েছে। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে তিনটি নৈর্বচনিক বিষয়ে দুই পত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বিকল্প অনেক বেশি ছিল। এ ছাড়া আবশ্যিক বিষয় ইংরেজি পরীক্ষা দিতে হয়নি।
এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষা ছিল মহামা’রির মধ্যে দ্বিতীয় কোনো পাবলিক পরীক্ষা। মহামা’রির কারণে ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অটোপাস দেওয়া হয়েছিল। এপ্রিলে এই পরীক্ষা হয়ে এলেও কোভিড পরিস্থিতিতে এবার আট মাস পিছিয়ে ডিসেম্বরে এ পরীক্ষা শুরু হয়। ফল তৈরিতে সাবজেক্ট ম্যাপিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রকাশিত ফলে নয়টি সাধারণ বোর্ডে এইচএসসিতে ৯৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ, মাদ্রাসা বোর্ডে আলিমে ৯৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডে এইচএসসিতে (ভোকেশনাল) ৯২ দশমিক ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
এইচএসসিতে নয় বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে যশোর বোর্ড। এ ছাড়া জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকেও অন্যান্য বছরের মতো এবারও সেরা ঢাকা বোর্ড। এইচএসসিতে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৯৬ দশমিক ২০ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৯ হাজার ২৩৩; রাজশাহীতে পাসের হার ৯৭ দশমিক ২৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩২ হাজার ৮০০; কুমিল্লায় পাসের হার ৯৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৪ হাজার ১৫৩; যশোরে পাসের হার ৯৮ দশমিক ১১ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ২০ হাজার ৮৭৮; চট্টগ্রামে পাসের হার ৮৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩ হাজার ৭২০; বরিশালে পাসের হার ৯৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৯৭১; সিলেটে পাসের হার ৯৪ দশমিক ৮০ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪ হাজার ৭৩১; দিনাজপুরে পাসের হার ৯২ দশমিক ৪৩ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫ হাজার ৩৪৯ ও ময়মনসিংহে পাসের হার ৯৫ দশমিক ৭১ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭ হাজার ৬৮৭।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক দিয়ে এবারও এগিয়ে আছে মে’য়েরা। ছা’ত্রীদের পাসের হার যেখানে ৯৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ, সেখানে ছাত্রদের মধ্যে পাস করেছে ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ বছর ছা’ত্রীদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৪০৬ জন। আর ছাত্রদের মধ্যে ৮৬ হাজার ৭৬৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। অর্থাৎ ছাত্রদের চেয়ে ১৫ হাজার ৬৪৩ জন বেশি ছা’ত্রী জিপিএ পেয়েছে এবার।
এবার পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। আর সব শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৯৩৪টি। এইচএসসিতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের দুটি, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের দুটি ও ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী ফেল করেছে এবার।
আর শতভাগ পাস করা ১ হাজার ৯৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৩টি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে। এ ছাড়া কারিগরি বোর্ডের ১৯৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
ঢাকা বোর্ডে ১৭৬টি, রাজশাহীতে ১৬২টি, কুমিল্লায় ৭৫টি, যশোরে ১১৬টি, চট্টগ্রামে ১৬টি, বরিশালে ৫৬টি, সিলেট ও দিনাজপুরে ৫৩টি করে এবং ময়মনসিংহে ২৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে।
গত বছর মহামা’রির কারণে উচ্চ মাধ্যমিকে পরীক্ষা না নিয়ে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষা মিলিয়ে মূল্যায়ন ফল প্রকাশ করা হয়। তাতে শতভাগ ছাত্রছা’ত্রী পাস করে। আর ২০১৯ সালের পরীক্ষায় ৯০৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থীই পাস করে, ৪১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। সংবাদ সম্মেলনে রোববার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, রেকর্ডসংখ্যক পাসের জন্য ‘সাবজেক্ট ম্যাপিং’ এবং সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুঘট’ক হিসেবে কাজ করেছে।
ভালো ফলের সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ভালো ফলে আম’রা এত অসন্তুষ্ট হই কেন? আমি আসলে এটা বুঝি না। আম’রা কি চাই না, আমাদের সন্তানরা ভালো করুক? এমন কি কোনো দিন আসবে না, যেদিন আমাদের কেউ অনুত্তীর্ণ থাকবে না? সবাই ভালো করবে, সবাই উত্তীর্ণ হবে। এটা কেন? এই মানসিকতা কেন?
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুয়েস্ট প্রফেসর ও শিক্ষাবিদ মোহাম্ম’দ কায়কোবাদ বলেন, উৎপাদনশীল শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদে শিক্ষায় সবচেয়ে বড় আ’ঘাত করো’না মহামা’রি। এতে লাগাতার ১৭ মাস সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এরপর দ্বিতীয় দফায় আবারও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রাই’মা’রি থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষায় সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে বাংলাদেশকে। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের বিদেশগামিতা কমেছে। মানোন্নয়নে শিক্ষার বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি ভালো শিক্ষক নিয়োগে জো’র দিতে হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম আমিরুল ইস’লাম বলেন, আবশ্যিক বিষয় ইংরেজি পরীক্ষা না থাকা পাসের হার বৃদ্ধির পেছনে একটা কারণ।
তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর ইংরেজি বিষয়ে ফেল করে বহু শিক্ষার্থী, এবার সে পরীক্ষা তাদের দিতে হয়নি, এটা একটা বড় কারণ বলে আমা’র মনে হয়। এ ছাড়া পরীক্ষা ১০০ নম্বরের হলেও উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে চাপ কম ছিল। প্রতি বছর যেখানে আটটি প্রশ্ন থেকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হয়, এবার ওই একই আটটি প্রশ্নের মধ্যে দুটি উত্তর লিখতে হয়েছে।
শিক্ষার সামগ্রিক চিত্র নিয়ে নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার হেমন্ত রোজারিও বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তো পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। পরীক্ষা হলেই শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা করে, অন্যথায় নয়। যেসব বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র সে বিষয়গুলো নিয়েই পড়াশোনা করেছে। বাকি বিষয়গুলো সিলেবাসে না থাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে তারা সেসব বিষয়ে পড়াশোনা করেনি। এর প্রভাব ভবিষ্যতে পড়বে। সব বিষয়ে পরীক্ষা না হওয়ার কারণে তাদের জ্ঞানের ঘাটতি থেকে যাবে।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, করো’নার কারণে শিক্ষার্থী অ’ভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের উৎকণ্ঠা ছিল। তার পরও শিক্ষার্থীরা মেধার পরিচয় দিয়েছে। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অটো পাসের শিক্ষার্থীদের বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তিতে কোনো সমস্যা হয়নি। এবার সব বিষয়ে পরীক্ষা না হলে আংশিক বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে। যারা ভর্তি হবে তারা ইতোমধ্যে অনেক প্রস্তুতি নিয়েছে। আর সামনে যে সময়টুকু আছে ভালো’ভাবে প্রস্তুতি নিলে আশা করি কোনো সমস্যা হবে না।