May 29, 2020

অবশেষে আন্দোলনের পর তাদের মুখে ফুটলো হাঁসি-কুলাউড়ার কালিটি চা-বাগানের শ্রমিকদের ১৩ সপ্তাহের বকেয়া মজুরী পরিশোধ

মাহফুজ শাকিল : মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কালিটি চা-বাগানের ৫৩৭ জন শ্রমিক ১৩ সপ্তাহের বকেয়া মজুরি পেয়েছেন। এর আগে বকেয়া মজুরীসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে বাগানের শ্রমিকেরা কয়েক দফায় ভূখা বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম করছিলেন। পরে এমন পরিস্থিতিতে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরীন বিষয়টি সমাধানের কার্যত উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বকেয়া মজুরী না পাওয়ায় অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে একের পর এক আন্দোলন ও বিক্ষোভ করে আসছিলো বাগানে শ্রমিকরা। অবশেষে ১৩ সপ্তাহের বকেয়া মজুরী পাওয়ায় শ্রমিকরা অনেক খুশি হয়েছেন বলে জানা গেছে। এই খুশিকে তারা তাদের আন্দোলনের বিজয় হিসেবে দেখছেন। অনেক শ্রমিক মজুরীর টাকা হাতে পাওয়ায় আনন্দ-উল্লাস করতে দেখা গেছে।
উপজেলা প্রশাসন ও বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালিটি বাগানের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান সিলেটের ‘জোবেদা টি কোম্পানি’। বাগানের ৫৩৭ জন শ্রমিক কাজ করেও ১৩ সপ্তাহ ধরে মজুরি পাচ্ছিলেন না। মজুরির দাবিতে তাঁরা বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছিলেন।
গত ১৫ এপ্রিল বকেয়া মজুরীর দাবিতে বাগানে ভূখা বিক্ষোভ মিছিল করে। এ নিয়ে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯ এপ্রিল বাগানের শ্রমিকরা আবারো বকেয়া মজুরীসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দাবিতে সাড়ে সাত কিলোমিটার লং মার্চ করে ভূখা বিক্ষোভ মিছিল করে কুলাউড়া শহরে এসে এক ঘন্টা প্রধান সড়ক অবরোধ করে। তাদের আন্দোলনের বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসে। চা-শ্রমিকদের বকেয়া মজুরীর দাবিতে ১৫১ জন নাগরিক বিবৃতি দেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। কিন্তুু তাদের এত আন্দোলন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির পরও বাগানের মালিকপক্ষ সমস্যা সমাধানে কোন কার্যত উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরীন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম সফি আহমদ সলমান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরীর মাধ্যমে বাগানের সৃষ্ট সমস্যার খবর জানতে পেরে নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

এ পরিস্থিতিতে বিষয়টির সমাধানের জন্য ২২ এপ্রিল উপজেলা ইউএনও’র কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিনের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে মালিকপক্ষ প্রথমে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে মজুরি পরিশোধের কথা দেয়। কিন্তু তা পরিশোধ করা হয়নি। পরে আরও কয়েক দফা সময় নেন তাঁরা। এরপর ফের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অবশেষে ১০ মে রবিবার বিকেল তিনটার দিকে বাগানের ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের সামনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শ্রমিকদের দাঁড় করিয়ে মজুরি প্রদান করা হয়। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তা চলে। গতকাল মোট ১ কোটি ৭ লাখ টাকা মজুরি প্রদান করা হয়। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম ফরহাদ চৌধুরী, কুলাউড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাদেক কাওছার দস্তগীর, কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়ারদৌস হাসান, জোবেদা টি কোম্পানির চেয়ারম্যান আবদুল খালিক, বাগানের ব্যবস্থাপক প্রণব কান্তি দেব, স্থানীয় কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ রহমান আতিক, কালিটি বাগান শ্রমিক পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি শম্ভু দাস, সম্পাদক উত্তম কালোয়ার প্রমুখ।


চা-শ্রমিক অনিমা অলমিক বলেন, ‘বকেয়া মজুরী আমাদের আন্দোলনের ফসল, ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কেটেছিলো। তাদের লেখাপড়ার খরচসহ অন্যান্য খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়েছে।
চা-বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সম্পাদক উত্তম কালোয়ার জানান, ‘শ্রমিকদের আন্দোলন সফল হয়েছে। সব শ্রমিক ১৩ সপ্তাহের বকেয়া মজুরি পেয়েছেন। এখন নগদ মজুরী পেয়ে শ্রমিকরা খুবই খুশি। এরজন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও সহযোদ্ধাদের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ।’
চা-বাগানের ব্যবস্থাপক প্রণব কান্তি দেব বলেন, ‘শ্রমিকদের মজুরী দেওয়া শুরু হয়েছে। কালিটি চা-বাগানের ৫৩৭ জন চা-শ্রমিকের নগদ মজুরী ও বকেয়া বোনাস দেওয়া শুরু হয়েছে। তারা ১৩ সপ্তাহের বকেয়া মজুরীসহ অন্যান্য ভাতাদি পাচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় বিশেষ করে জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরীন স্যারের বিশেষ উদ্যোগে কয়েক দফায় বৈঠক করে সমাধানের পথ বের করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ বিভাগের সহযোগিতায়ও ছিল। তিনি আরও বলেন, ১৩ সপ্তাহের মজুরীসহ ২০১৫ সাল থেকে বকেয়া বিভিন্ন ভাতাসহ ‘নগদ প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ৮৯৭ টা চা-শ্রমিকদের দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ২০০ শ্রমিককে এককালীন ৫ হাজার টাকা করেও দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরীন বলেন, প্রশাসন সবসময় কালিটি চা বাগানের শ্রমিকদের পাশে ছিল, এখনো আছে। বাগানের সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর বাগানের মালিকপক্ষকে কঠোর চাপপ্রয়োগ করায় একটা সন্তোষজনক সমাধান হয়। ইতোমধ্যে শ্রমিকদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। আগামীতেও সবসময় জেলা প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ