March 31, 2020

করোনার প্রভাবে কুলাউড়ায় পেঁয়াজের ঝাঁজ, নিয়ন্ত্রণে ইউএনও এসিল্যান্ডের অভিযান

মাহফুজ শাকিল : মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছেন উপজেলা প্রশাসন। করোনা ভাইরাস আতঙ্কের সুযোগে নিয়ে হঠাৎ করে পণ্যেদ্রব্যের দাম বৃদ্ধি করেন কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। এমন অভিযোগের খবর পেয়ে বাজারে মনিটরিংয়ের জন্য মাঠে অভিযানে নামেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
গত দুই দিনে পৃথক পৃথক অভিযানে কুলাউড়ায় ২৬ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজরাতুন নাঈমের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত। অভিযানকালে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কুলাউড়া সার্কেল) সাদেক কাওসার দস্তগীর, কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়ারদৌস হাসান, ওসি (তদন্ত) সঞ্জয় চক্রবর্তী প্রমুখ।
শুক্রবার রাতে তিন ঘন্টা ব্যাপী চলা অভিযানে উপজেলার ভাটেরা বাজারে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করায় ভাটেরা ট্রেডার্সকে ৫০ হাজার টাকা এবং একই স্থান ও বরমচাল এলাকার আরও ৬ প্রতিষ্ঠানকে মোট ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন ইউএনও এটিএম ফরহাদ চৌধুরী। রবিরবাজার এলাকায় অতিরিক্ত দামে পেঁয়াজ বিক্রি ও মূল্য তালিকা না রাখায় বাজারের দোকান মালিক মুহিত দেবকে ৫ হাজার, মাসুক মিয়াকে ৫ হাজার, জাহিদ মিয়াকে ৫ হাজার, হারুনুর রশীদকে ৫ হাজার, শমরেন্দ্রকে ৫ হাজার, জয়নাল মিয়াকে ৮ হাজার, আব্দুর নুরকে ৫ হাজার, বিময় দেবকে ১০ হাজার, কামাল মিয়াকে ৮ হাজার ও ফয়েজ উদ্দিনকে ৬ হাজারসহ মোট ৬২ হাজার টাকা জরিমানা করেন এসিল্যান্ড নাজরাতুন নাঈম। এরআগে বৃহস্পতিবার রাতে কুলাউড়া শহরের স্টেশন চৌমুহনী, উত্তর বাজার ও ব্রাহ্মণবাজার এলাকায় রাত সাড়ে ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত অভিযান কালে পৌর শহরের স্টেশন চৌমুহনী এলাকায় পেঁয়াজ বেশি দামে বিক্রি করায় সিকান্দার স্টোরকে ২০ হাজার টাকা, উত্তর বাজার এলাকায় সাইফুদ্দিন ব্রার্দাসকে ৩০ হাজার টাকা, জলিল এন্ড ব্রাদার্সকে ৫ হাজার টাকা ও ব্রাহ্মণবাজার এলাকায় কানু স্টোরকে ১০ হাজার টাকাসহ মোট ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন ইউএনও এটিএম ফরহাদ চৌধুরী, পৌর শহরের দক্ষিণ বাজার এলাকায় স্বর্ণা ভেরাইটিজ ষ্টোরকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৩০-৩৫ টাকা বেশি করে পেঁয়াজের মূল্যে রাখার অভিযোগে ৫ হাজার টাকা, আজমল এন্ড সন্সকে ৪ হাজার টাকা ও আতাউর এন্ড ব্রাদার্সকে ৪ হাজার টাকা, হাসান ট্রেডার্সকে বেশি দামে সার্জিক্যাল মাস্ক বিক্রি করায় ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন এসিল্যান্ড নাজরাতুন নাঈম। এছাড়া স্টেশন রোডের পাকশী রেষ্টুরেন্টকে লাইসেন্স না থাকায় ১০ হাজার টাকা, গ্রীণভিউ রেস্টুরেন্টকে অপরিষ্কার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও সংরক্ষণের অভিযোগে ৬ হাজার টাকাসহ মোট ৩৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তবুও কোন ধরনের নির্দেশনা মানছেননা বাজারের ব্যবসায়ীরা। প্রায় সর্বত্র ঠিকই চড়ামূল্যে বিক্রি করছেন পেঁয়াজ। কোথাও কোথাও ৮০ টাকা থেকে ১০০ টাকার কমে পেঁয়াজ মিলছে না। কুলাউড়া শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পেঁয়াজের দাম নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০- ৪৫ টাকা করে বেশি দামে বিক্রি করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। করোনার আতঙ্কের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের এমন পেঁয়াজ বাণিজ্যের বিষয়টি গত দুইদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাউর হলে এ নিয়ে সমগ্র উপজেলা জুড়ে চলে নানান সমালোচনা। সবাই প্রশাসনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বাজার মনিটরিংয়ের জন্য। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কুলাউড়া শহরের উত্তরবাজার, দক্ষিণবাজার, স্টেশন রোড, কুলাউড়ার সর্ববৃহৎ রবিরবাজার ও ব্রাহ্মণবাজার, ভাটেরা বাজার, ভূকশিমইল নবাবগঞ্জ বাজার, বরমচালের কালা মিয়ার বাজার, ফুলেরতল বাজার, কর্মধার কাঁঠালতলী বাজার, রাউৎগাঁও পীরের বাজার, গাজীপুর বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০-৪৫ টাকা করে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। কোন কোন বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দামি ৭০-১০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে সাধারণ ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে বাধ্য হয়ে পেঁয়াজ কিনছেন। কারণ তারা মনে করছেন, করোনার প্রভাবে যদি পেঁয়াজের দাম আরো বেশি করে বৃদ্ধি পায় এরজন্য তারা এখন পেঁয়াজ ক্রয় করে রাখছেন। কুলাউড়া শহরের উত্তরবাজার এলাকায় এক ক্রেতা একটি দোকান থেকে ৫ কেজি পেঁয়াজ ৭৫ টাকা করে ক্রয় করেন। পরে ভ্রাম্যমান আদালতের সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ওই পাঁচ কেজি পেঁয়াজের বাড়তি টাকা ফেরত দেন ওই দোকানী। দক্ষিণ বাজার এলাকায় একজন ক্রেতা জানালেন, তিনি একাই ২৭ কেজি পেঁয়াজ ৭৫ টাকা করে ক্রয় করেছেন। ব্রাহ্মণবাজারে আরেক দরিদ্র ক্রেতা জানালেন, তিনি ১০০ টাকা করে অর্ধ কেজি পেঁয়াজ ক্রয় করেছেন। তবে ভ্রাম্যমান আদালতের সময় ওই দোকানী ক্রেতার কাছ থেকে নেয়া বাড়তি টাকা ফেরত দিয়েছেন।
কুলাউড়া ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি বদরুজ্জামান সজল বলেন, করোনার সুযোগ নিয়ে সম্মানীত ক্রেতাদের যাতে হুয়রানি করে পেঁয়াজের দাম বেশি না রাখা হয় সেজন্য আমরা ব্যবসায়ীদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যে দাম রয়েছে সেই দামে ক্রেতাদের কাছে পণ্যে বিক্রি করতে হবে। ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সচেতন করার জন্য শহরে মাইকিং করানো হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী বলেন, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে কুলাউড়া শহর ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন পাইকারী ও খুচরা দোকানে মনিটরিংয়ের পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। করোনা আতঙ্কের সুযোগ নিয়ে কোন ব্যবসায়ীরা যাতে দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি না করতে পারে সেজন্য বাজার সমিতিকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে শহরে মাইকিং করানোর জন্য। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত উপজেলা প্রশাসনের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সর্বশেষ সংবাদ