April 1, 2020

প্রক্সিযুদ্ধ এবং আদর্শিক বিভাজন

রায়হান আহমেদ তপাদার : আবারো আলোচনায় এসেছে লিবিয়া, যেখানে শান্তি আনার জন্য যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সাথে আলোচনার চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। লিবিয়ায় এ মুহূর্তে দুটি পরস্পরবিরোধী প্রশাসন সক্রিয় আছে: একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতিসংঘ স্বীকৃত প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল সেরাজ এবং অন্যটি জেনারেল খলিফা হাফতারের বিদ্রোহী বাহিনী। লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়াকে নিয়ে পশ্চিমাদের নানা ষড়যন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের কারণে দেশটিতে শান্তি যেন সুদূরপরাহত। ২০১১ সালের অক্টোবরে গাদ্দাফির পতনের পর থেকে চলমান গৃহযুদ্ধে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের হস্তক্ষেপে দেশটির অবস্থা এখন বিপন্নপ্রায়। লিবিয়া এখন কার্যকরভাবে একটি বিভক্ত দেশে পরিণত হয়েছে। দেশটিতে শিগগিরই শান্তি ফিরে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অধিকন্তু দেশটিতে প্রক্সিযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক ও আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে আবার বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি তুরস্ক ও লিবিয়া চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায় সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে এক দিকে ত্রিপোলি সরকার সেটাকে আঙ্কারা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে; অন্য দিকে রয়েছে জেনারেল হাফতারে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও উপসাগরীয় দেশগুলো জেনারেল হাফতারকে সমর্থন দিচ্ছে। গাদ্দাফীর শাসন ও তাঁর জীবনাবসান পরবর্তী লিবিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম হবে-এমনটাই ছিলো গণবিপ্লবের প্রাথমিক লক্ষ্য। তবে লিবিয়ায় সেটা হয়নি, অদ্যাবধি লিবিয়া অশান্ত, অস্থিতিশীল ও যুদ্ধরত অবস্থায় আছে।

২০১১ সালের গণবিপ্লবের নিট ফলাফল লিবিয়ার জন্য একটি বিপজ্জনক অবস্থার ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছিলো মাত্র। গাদ্দাফীর পতন পরবর্তীতে বিদ্রোহীরা একমাত্র বৈধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে গঠন করেছিলো-‘ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) যেটাকে সমর্থন দিয়েছিলো জাতিসংঘ। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতা হলো-গাদ্দাফির পতন পরবর্তী সময়কাল থেকে এখন পর্যন্ত লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি, বরং চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য এবং অরাজকতা। এখন দেশটাতে রয়েছে দু’টি কর্তৃপক্ষ। জাতিসংঘ স্বীকৃত-‘গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল এ্যাকর্ড তথা জি.এন.এ সরকার একদিকে; যার নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী ফায়াজ আল সারাজ। আর অন্যদিকে রয়েছে-লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি তথা এলএনএ-যার নেতৃত্বে রয়েছেন জেনারেল খালিফা হাফতার। অর্থাৎ লিবিয়া এখন সম্পূর্ণ দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে এবং দু’টি কর্তৃপক্ষ লিবিয়ার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য, একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য অব্যাহতভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ দু’টি কর্তৃপক্ষের বাইরেও লিবিয়ায় কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য বিভিন্ন মত ও পথের অসংখ্য সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী তৎপর রয়েছে। লিবিয়াতে এখন যার হাতে যত বেশি অস্ত্র, তার শক্তি এবং প্রভাব তত বেশি। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা অনেকে মনে করেন-লিবিয়া এখন অস্ত্রের বাজারে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, অতি সাম্প্রতিককালে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নতুন করে তেল-গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং এই তেল-গ্যাসের মালিকানা নিয়ে অন্যান্য কোস্টাল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে তুরস্কের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে উভয় দেশের ইক্সক্লোসিভ ইকোনমিক জোন এর নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য ইতোপূর্বে তুরস্ক ও লিবিয়ান জি.এন.এ সরকারের মধ্যে মেরিটাইম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

তুরস্ক সর্বদাই সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা ও মোকাবেলা করে নিজেদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করে চলেছে অত্রাঞ্চলে। লিবিয়ার জিএনএ সরকারের নেতৃত্বে লিবিয়ার অখন্ডতা রক্ষার জন্য এবং একই সাথে আঞ্চলিক শান্তি রক্ষার উদ্দেশ্যেই তুরস্ক লিবিয়ার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে-এক টুইট বার্তায় বলেছেন তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফুয়াটগুকটে।
লিবিয়ার জি.এন.এ সরকারের পক্ষে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যেই তুরস্ক এই সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে আনকারার সরকারী কর্তৃপক্ষের অভিমত। তুরস্ক লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে জড়িত হতে ইচ্ছুক নয়; তবে লিবিয়ার জাতিসংঘের সমর্থিত বৈধ জি.এন.এ সরকারকে জেনারেল হাফতার বাহিনী ক্ষমতা থেকে ফেলে দেবে তা কখনো তুরস্ক হতে দেবে না। লিখেছেন ইবনে হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের বিশেষজ্ঞ তালহা কচি। লিবিয়ায় তুরস্কের সেনা মোতায়েন লিবিয়া সম্পর্কে তুরস্কের গুরুত্বের বিষয়টা স্পষ্ট করেছে। লিবিয়ার সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক রক্ষা, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বহিরাগতের কবল থেকে তুরস্কের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে তুরস্কের দীর্ঘ মেয়াদী ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য-বলেছেন মিঃ তালহা কচি। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের গ্যাস ক্ষেত্র থেকে ইতালি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে গ্যাস রপ্তানী ও সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে ২০০০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য পাইপ লাইন স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গ্রীস, গ্রীক সাইপ্রিয়ট প্রশাসন এবং ইসরাইল ইতোপূর্বে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরববসন্ত খ্যাত ২০১১ সালের গণবিপ্লবের ঢেউ লেগেছিলো আফ্রিকার দেশ লিবিয়াতে এবং ঢেউয়ের প্রচন্ড আঘাতে দেশটার দীর্ঘকালীন একনায়ক শাসক গাদ্দাফীর পতন হয়েছিলো।

বলা হয়ে থাকে লিবিয়ার বিদ্রোহী বাহিনীর নামে আমেরিকার সেনারাই গাদ্দাফীকে হত্যা করেছিলো।
অসংখ্য অস্ত্রবাজ সশস্ত্র গ্রুপ লিবিয়ায় শাসন কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য লড়াই করলেও এটা সত্য যে, লিবিয়া এখন মূলত: ফায়াজ আল সারাজ এবং জেনারেল খালিফা হাফতারের নেতৃত্বে দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। রাজধানী ত্রিপলি ও আশপাশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন ফায়াজ; তার সরকারকে বলা হয় জাতীয় ঐক্যমতের সরকার বা জিএনএ সরকার। জাতিসংঘ এই সরকারকে লিবিয়ার বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৬ সালে এ সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর থেকে মি. সারাজ বিভিন্ন মিলিশিয়া ও রাজনীতিকদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু পুরো দেশের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারেননি। এমনকি, তাঁর সরকারের অধীনে যে সেনাবাহিনী রয়েছে, তার ওপরও তাঁর পূর্ণ কর্তৃত্ব নেই।
মি. সারাজের বিপরীতে তবরুক ভিত্তিক একটা সরকার রয়েছে-যার নেতৃত্বে দিচ্ছেন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এলএনএ এর প্রধান জেনারেল হাফতার। বলা হয়ে থাকে-হাফতারের নেতৃত্বেই এখন লিবিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। হাফতার বাহিনী এখন লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলী দখল করার লক্ষ্যে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ত্রিপোলীর দিকে এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে লিবিয়ার তেল খনিগুলোর সিংহভাগই দখলে নিয়েছে হাফতার বাহিনী।
লিবিয়ায় শাসন কর্তৃত্ব স্থাপন ও কায়েমে যখন দ্বিমুখি লড়াই অব্যাহত রয়েছে সে সময়ে বহি:রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থরক্ষায় নিজেদের পছন্দের পক্ষকে সমর্থন দেওয়ায় লিবিয়ার রাজনৈতিক সংকট আরো গভীরতর হয়ে ওঠেছে।

সবমিলে তাই জটিল এক জালে জড়িয়ে গেছে লিবিয়া ও এর জনগণ। ফলে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পতন হলেও গত প্রায় আট বছরেও গণতন্ত্রের মুখ দেখেনি লিবিয়ার মানুষ। লিবিয়ার বিদ্যমান এ সংকটের জন্য বিদেশী রাষ্ট্রগুলো অনেকাংশে দায়ি। বলা হয়ে থাকে ত্রিপোলী ভিত্তিক ফারাজ আল সারাজ এবং তবরুক ভিত্তিক জেনারেল হাফতার, এ দু’টি সরকারের পক্ষে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং এমনকি জাতিসংঘ।
যেমনটা উল্লেখ করেছি- মি. সারাজ সরকারের সমর্থনে রয়েছে জাতিসংঘ। আর অধিকাংশ পশ্চিমা দেশই মি: সারাজ সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, জেনারেল হাফতারের সমর্থনে রয়েছে-সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া ও ফ্রান্স। বহিরাষ্ট্রসমূহের কারণেই লিবিয়া সংকট সমাধানে অগ্রগতি নেই; বরং সংকট আরো বেড়ে চলেছে এ মাসে মি: সারাজ সরকারের প্রতি তুরস্কের সামরিক সমর্থন প্রদানের ফলে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী-তুরস্কের পার্লামেন্টের অনুমোদনক্রমে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েফ এরদোগান লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ফারাজ আল সারাজের সমর্থনে সেনাবাহিনী প্রেরণ ও মোতায়েন করেছেন লিবিয়াতে। তুরস্কের সেনা মোতায়েনের ফলে লিবিয়ার সংকট আরো জটিল হবে বলে মনে করছেন রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। যদিও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তেমনটা মনে করেন না। প্রেসিডেন্ট এরদোগান মনে করেন তুরস্কের সেনা মোতায়েনের ফলে লিবিয়ার সংকট উত্তরণে সহায়ক হবে। কিন্তু তুরস্কের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে-সেনা ও অস্ত্রাদি মোতায়েন কেবলমাত্র ডিফেনসিভ এবং এর ফলে দেশটার বৈধ জিএনএ লিড প্রধানমন্ত্রী সারাজ ও লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির নেতৃত্বাধীন জেনারেল হাফতার বাহিনীর মধ্যেকার বিরাজমান সশস্ত্র সংঘাত নিরসনে ভূমিকা পালন করবে।

অন্যদিকে আনকারা-ত্রিপোলী চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান স্পষ্ট করেই বলেছিলেন যে, গ্রীক, গ্রীস সাইপ্রিয়ট, মিসর ও ইসরাইল-তুরস্কের সম্মতি ব্যতীত প্রাকৃতিক গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে না।’ তুরস্ক সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য যে, ইউ.এস.এ, রাশিয়া, ইইউ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো তুরস্কের সম্মতি ব্যতীত লিবিয়ার ভবিষ্যত প্রশ্নে এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। একইভাবে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের প্রাকৃতিক গ্যাসের বিষয়েও এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না। একক যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রতিহত করবে তুরস্ক ও লিবিয়া। লিবিয়ায় তুরস্কের বিশেষ প্রতিনিধি জানিয়েছেন পুতিনের আগামী ৮ জানুয়ারি তুরস্ক সফর করার কথা রয়েছে। সে সময় দু’পক্ষ লিবিয়া নিয়ে আলোচনা করবে। সম্প্রতি তুরস্ক সাইপ্রাস অভিমুখী একটি ইসরাইলি জাহাজকে ভূমধ্যসাগর ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। ওই জাহাজ ভূমধ্যসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে এসেছিল বলে জানা গেছে। তুরস্ক ওই অঞ্চলে যে বাইরের হস্তক্ষেপ বরদাশত করবে না ইসরাইলি জাহাজকে ওই এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য করার মাধ্যমে তারই ইঙ্গিত পাওয়া গেল। সুতরাং তুরস্ক লিবিয়ার সাথে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, সে ব্যাপারে তারা খুব সিরিয়াস বলে মনে হচ্ছে। তবে তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে বিষয়টি ঠাণ্ডা মাথায় সমাধানের পথ বেছে নেয়াটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সিরিয়ায় সঙ্ঘাত ও উত্তেজনার পর লিবিয়াও সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়লে সেটা কারো জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

লেখক ও কলামিস্ট-raihan567@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ