December 12, 2019

মৌলভীবাজারে গ্রাম আদালত সক্রিয়-শুনানি করে মামলা নিষ্পত্তিতে হাজিপুর ইউনিয়ন এগিয়ে

মাহফুজ শাকিল : অল্প সময়ে স্বল্প খরচে সঠিক বিচার পেতে চল যাই গ্রাম আদালতে। এই মূলমন্ত্রকে নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে মৌলভীবাজার জেলার সবক’টি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত। অতি সহজেই সেবা পাচ্ছে শতশত ভুক্তভোগী অসহায় নারী-পুরুষ। এই জেলার গ্রাম আদালতের সক্রিয়তা অনুসন্ধানে জানা যায়, শুনানি করে বিচার নিষ্পত্তির দিক দিয়ে জেলার কুলাউড়ার হাজিপুর ইউনিয়ন দুই বিভাগের মধ্যে এগিয়ে গেছে। আর এর নেপথ্যে রয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত বাচ্চু।

গ্রাম আদালতে শুনানী করে মামলা নিষ্পত্তির দিক দিয়ে ইতিপূর্বে জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করে হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ। আব্দুল বাছিত বাচ্চু ওই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। চেয়ারম্যানের পূর্বে তিনি পেশায় ছিলেন একজন সাংবাদিক। করেছেন রাজনীতিও। এখন জনপ্রতিনিধি। যার অক্লান্ত প্রচেষ্ঠা আর শ্রমে বদলে গেলে হাজীপুর ইউনিয়নের বিচার ব্যবস্থা।

ইউএনডিপির সহায়তায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) গ্রাম আদালত সক্রিয় করার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের ২য় পর্যায়ের প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয় হাজীপুর ইউনিয়ন।

হাজিপুর ইউনিয়নে গ্রাম আদালত শুরুর পর থেকের এ পর্যন্ত মোট মামলা হয়েছে ১৬৪ টি। সমাধান হয়েছে ১৫৭টি। তাছাড়া গ্রাম আদালতে বিভিন্ন ধাপে মামলা নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে গ্রাম আদালত গঠন করে শুনানী করে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৮টি, প্রাক বিচারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় ৯টি ও গ্রাম আদালত বিধি ৩১ অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি হয় ৩০টি। গ্রাম আদালত থেকে উচ্চ আদালতে মামলা প্রেরণ করা হয় ১০টি।

সরেজমিন হাজীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন মানুষের সাথে আলাপ করলে জানা যায়, সপ্তাহের রবিবার ও বুধবার গ্রাম আদালত বসে। এজলাসের মাধ্যমে বিচারকাজ শুরু হয়। গ্রাম আদালতে সমাধান পেয়েছেন ওই ইউনিয়নের ১৫৭টি পরিবার। হাজিপুর ইউনিয়নের ভূঁইগাঁও গ্রামের মনফর মিয়ার স্ত্রী শারমিন আক্তার একই গ্রামের মদরিছ আলীর বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ এনে গ্রাম আদালতে মামলা করেন। ১৩ নভেম্বর মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে মদরিছ আলীর দখলে থাকা ১০ শতক জমি শারমিন আক্তারকে ফিরিয়ে দেবার রায় প্রদান করা হয়। এর আগে গ্রাম আদালতে শুনানীর মাধ্যমে ২৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ইউনিয়নের ইসমাইলপুর গ্রামের মো. আলমাছুর রহমান, পাইকপাড়া গ্রামের রফিক মিয়ার স্ত্রী আছিয়া বেগম গ্রাম আদালতে মামলা করে বিবাদীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ৩০ হাজার টাকা, বিলেরপার গ্রামের জমির আলী গ্রাম আদালতে মো. ফারুক মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ৪৫ হাজার টাকা, চান্দগাঁও গ্রামের মৃত শমসর আলীর ছেলে মছদ্দর আলী তাঁর মৌরসী ১৫ শতাংশ জমি নিয়ে বিগত ৩০ বছর ধরে ইউনিয়নের তৎকালীন সকল জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে ধরনা দিলেও কোন সমাধান পাননি। পরে বর্তমান চেয়ারম্যান তাঁর বিষয়টি আমলে নিলে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে ৩০ বছর পর এই জমি ফিরে পেয়েছেন। পরে এই জায়গা বিক্রি করে তিনি তাঁর মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ইউনিয়নের পাবই গ্রামের জয়নুল মিয়া দীর্ঘ ৪০ বছর পর ৫ শতক ভূমি গ্রাম আদালতের মাধ্যমে ফিরে পেয়েছেন।

গ্রাম আদালতে উপকারভোগী শারমিন আক্তার, আছিয়া বেগম, জমির আলী, মছদ্দর আলী ও জয়নুল মিয়া জানান, আমাদের সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে দৌড়ঝাঁপ করেছি। কিন্তুু কোন সমাধান পাইনি। অবশেষে গ্রাম আদালতে গিয়ে বিচার চাইলে বর্তমান চেয়ারম্যান বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আমলে নিলে আমরা এর সমাধান সহজেই পেয়েছি।

২২ জুন মৌলভীবাজারে দুই দিনব্যাপী গ্রাম আদালত বিষয়ক রিফ্রেশার্স প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করতে গিয়ে মৌলভীবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলাম জানালেন, শুধু মৌলভীবাজার জেলা নয়, শুনানি করে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভাগের মধ্যে এগিয়ে হাজীপুর ইউনিয়ন। উদ্বোধনের পর ইউএনডিপির প্রতিনিধিরা ২০১৭ -১৯ পর্যন্ত গ্রাম আদালতে মামলা নিষ্পত্তির চিত্র তুলে ধরেন। গ্রাম আদালতের সক্রিয় কার্যক্রম শুনানির মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির দিক দিয়ে জেলার মধ্য হাজীপুর ইউনিয়ন প্রথম স্থান হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়।

হাজিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, ২০১৬ সালে আমি হাজীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। ২০১৭ সাল থেকে ইউনিয়নে নিয়মিত গ্রাম আদালতে বিচার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিরোধ নিষ্পত্তি, আপোষ নিষ্পত্তি এবং শুনানির মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি করা হয়। শুনানি হলো গ্রাম আদালতের মূল ভিত্তি। তাছাড়া গ্রাম আদালতের বিভিন্ন সচেতনতামূলক সেমিনার ও কাউন্সিলিং করে গ্রামের প্রত্যেক শ্রেণীর পেশার লোকদের গ্রাম আদালত সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে। যার ফলে আগের তুলনায় অনেক মামলা বেড়েছে এতে লোকজন অতি সহজেই উপকৃত হচ্ছে।

ইউএনডিপির ডিস্ট্রিক্ট ফ্যাসিলেটর (জেলা সহায়ক) মো. মাহাবুব উল আলম বলেন, জেলার মধ্যে শুনানি করে মামলা নিষ্পত্তির দিক দিয়ে অন্যান্য ইউনিয়নের তুলনায় হাজিপুর ইউনিয়ন অনেক দূর এগিয়ে আছে। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দক্ষতার কারণে এসকল মামলা সহজেই নিষ্পত্তি হচ্ছে বলে মনে করি।

সর্বশেষ সংবাদ