December 12, 2019

কালের সাক্ষী জীবন্ত পৃথিমপাশার জমিদার বাড়ি

মাহফুজ শাকিল : চকচকে দালান মসজিদ আর ইমামবাড়া। বিশাল দিঘীতে শান বাধানো ঘাট। আন্দরমহলে প্রবেশ করলে প্রাসাদগুলোতে ফুঠে উঠছে কোথায় পারস্যে, কোথায় মুঘল, বৃটিশ আমলের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকীর্তি। জমিদারী প্রথা না থাকলেও পূর্ব সিলেটের তৎকালীন জমিদার নবাব আলী আমজদের ঐতিহাসিক নবাব বাড়িটি আজও দেশের মধ্যে জীবন্ত কালের সাক্ষী হয়ে আছে। জমিদারির অনেক স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক এই বাড়িতে এখনও উত্তরাধিকারীরা বসবাস করছেন। জেলা সদর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার পূর্বে পৃথিমপাশা নবাব বাড়ির অবস্থান। পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুদূর পারস্যে থেকে ধর্ম প্রচারের জন্য এই অঞ্চলে আগমণ ঘটলেও ধর্মীয় প্রচার, জমিদারী, সমাজসেবা, শিক্ষার প্রসার, কখনো জনপ্রতিনিধি অনেক কিছুই রয়েছে নবাব বাড়ির ঐতিহ্যকে ঘিরে। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলেও মানুষের কল্যাণে কাজ করে মন্ত্রী থেকে শুরু করে এমপি ও চেয়ারম্যানসহ নানা পদে আজও বিচরণ রয়েছে নবাব পরিবারের উত্তরসূরিদের। উত্তরসূরীদের দাবি- এখনও মানুষ তাদের ভালোবাসে এবং সম্মান ও মর্যাদা দেয়।

জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য :
জমিদার বাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে আলী আমজদ খাঁন মৌলভীবাজার ও কুলাউড়ায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা এবং সুপেয় পানির জন্য দীঘি খনন করেন। বাড়িতে ঢুকতেই হাতের বামপাশে রয়েছে বিশাল একটি দীঘি। জমিদার বাড়ির চিত্র চোখের সামনে ফুটে উঠতেই মনে হয় অনেক দিন আগের ভাঙাচোরা পলেস্তার খসে যাওয়া দেওয়াল, কোনো লোকের বসবাস নেই, দেওয়ালের গা বেয়ে গজিয়ে উঠেছে বটগাছ ইত্যাদি। কিন্তুু ৩৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ি পুরানো হলেও আজও অবধি বাড়িটি সাজানো গোছানো রয়েছে। প্রায় তিনশত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গৌরবের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ি (নবাব বাড়ি)। বাড়ির কারুকার্যময় আসবাবপত্র, মসজিদের ফুলেল নকশা, ইমামবাড়া, সুবিশাল দীঘি যেকোনো ভ্রমণপিপাসুকে আকৃষ্ট করতে যথেষ্ট। তবে জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এখানকার ইমামবাড়া। জমিদারের পাশাপাশি এতদ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে পৃথিমপাশার নবাববাড়ি। বর্তমানে হোছেনী দালান মসজিদ এবং বড় একটা দিঘী অবস্থিত। জমিদার বাড়ীতে হাতীর পিলখানা, বাঘ, হরীণ, ময়ূর ইত্যাদি ছিল। জমিদারদের ব্যবহার করা অনেক জিনিসপত্র রয়েছে এ বাড়িতে। রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য এখানে লোক রয়েছে। জমিদারদের জমিদারী প্রথা আজ আর নেই। তবে রয়ে গেছে সুবিশাল বাড়ি, ব্যবহৃত আসবাবপত্র এবং তাঁর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আলী আমজাদ খাঁনের উত্তরসূরীরাই দেখাশুনা করেন জমিদার বাড়িটি।

পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির ইতিহাস থেকে :

মুঘল স¤্রাট আকবরের সময়কালে ১৪৯৯ সালে পারস্য (ইরান) থেকে ধর্ম প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে আসেন সাকি সালামত খাঁন। তাঁর ছেলে ইসমাইল খান ওরফে খান জাহান আলী উড়িষ্যার গভর্ণর থাকাকালে দাউদ খান কররানীর সাথে যুদ্ধ হলে ১৫৫৬ সালে তিনি ভারত থেকে পৃথিমপাশায় ইসলাম প্রচারের জন্য আগমন করেন। খানে জাহান খান হিসেবে পরিচিত ইসমাইল খানের নামে পৃথিমপাশার জমিদার বাড়ির দিঘীর নামকরণ করা হয়। ইসমাইল খানের ছেলে শামসুদ্দিন খান। শামসুদ্দিন খানের ছেলে রবি খান। ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালীন সময়ে পূর্ব সিলেটের প্রথম মাদ্রাসা পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ি কর্তৃক কুলাউড়ায় রবিরবাজার হাফিজি মাদ্রাসা প্রতিষ্টা করা হয়। এসময় এতদ অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের জন্য জমি দান করে ১৭৫৬ সালে ঐতিহ্যবাহী রবিরবাজার হাট প্রতিষ্ঠা করেন রবি খান। রবি খাঁনের ছেলে মোহাম্মদ আলী খান ১৭৭৩ সালে সিলেটের তৎকালীন কাজী (বিচারক) পদে নিযুক্ত ছিলেন। নবাব আলী আহমদ খানের ছেলে নবাব আলী আমজদ খাঁন। পূর্ব বাংলার সময়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মামলা করেন নবাব আলী আমজদ খাঁন। ১৮৯৭ সালে গৌছ আলী খান পৃথিমপাশায় নবাবী লাভ করেন। গৌছ আলী খান হলেন সিলেটের তৎকালীন কাজী মোহাম্মদ আলী খানের পিতা। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় গৌছ আলী খানের সময়কালে চট্টগ্রাম থেকে অস্ত্র লুণ্ঠন করে বড়লেখা শাহবাজপুর যাবার পথে পৃথিমপাশায় আশ্রয় নেন সিপাহীরা। সে সময় সিপাহীদের আশ্রয় দেবার কারণে নবাব গৌছ আলী খানের উপর ব্রিটিশরা রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা করেন। বৃটিশদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বৃটিশরা গৌছ আলী খানকে ফাঁসি দেবার চেষ্ঠায় লিপ্ত হয়। কিন্তুু সেই সময় সিলেট থেকে পৃথিমপাশা পর্যন্ত মানুষের লাইন পড়ে। বিচারক তখন গৌছ আলী খানের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখে শাস্তি হিসেবে ফাঁসি না দিয়ে জরিমানা করেন। খ্যাতিমান জমিদার নবাব আলী আমজদ খানের দুই উত্তরাধিকারী হলেন নবাব আলী হায়দার খান ও নবাব আলী আজগর খান। তাদের আমলেই মুলত বাড়ির অভ্যন্তরে দুটি ভাগ হয়ে যায়। আলী হায়দার খানের দুই পুত্র ছিলেন তারা হলেন আলী ছফদর খান ওরফে ‘রাজা সাহেব’ ও আলী ছরওয়ার খান ওরফে ‘চুন্নু নবাব’। এরমধ্যে আলী ছফদর খান রাজা সাহেব ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত এক নাম। জমিদার ঘরে জন্ম নিয়েও জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত আন্দোলনে মাওলানা ভাসানীর সাথে সক্রিয় ভূমিকা রেখে সাধারণ মানুষের ব্যাপক ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হন। স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন মহকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপের রাজনীতি করেন। অপর পুত্র আলী সারওয়ার খান ওরফে চুন্নু নওয়াব ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালের উপ-নির্বাচনে কুলাউড়া আসনের প্রথম এমপি নির্বাচিত হন।
নবাব আলী আমজদের অপর পুত্র নবাব আলী আজগর খান ১৯৪৬ সালে মুসলিমলীগের দিল্লী কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে এমএলএ নির্বাচিত হন। আলী আজগরের এক উত্তরাধিকারী হলেন নবাব আলী ইয়াহর খাঁন। তিনি দু’বার মেম্বার অব প্রভেন্সিয়ালী এ্যাসেম্বলি (বেসিক ডেমোক্রেসি) মৌলিক গণতন্ত্র পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায় :
১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ শাসকদের কর্তৃক নাগা কুকিদের বিদ্রোহ দমনে সিলেটের তৎকালীন কাজী মোহাম্মদ আলী খাঁন বলিষ্ট ভূমিকা রেখে ইংরেজদের সাহায্য করেন। এজন্য ইংরেজ সরকার খুশি হয়ে মোহাম্মদ আলীর ছেলে গৌছ আলী খাঁনকে ১২০০ হাল বা ১৪ হাজার ৪০০ বিঘা নিষ্কর জমি দান করেন এবং জমিদারী উপাধী দেন। পরবর্তীতে ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখার জন্য মুঘল আমলে স¤্রাট আরঙ্গজেব ১৭০৭ সালে ৫৩৬৩ একর জমি জমিদার পরিবারকে উপহার দেন। এরপর স¤্রাট দ্বিতীয় আলমগীর ১৭৫৪ সালে ৪৩৮৭ একর জমি আরো বৃদ্ধি করে দেন। পরবর্তীতে আরো ৯৭৫ একর জমি ১৭৫৬ সালে দান করেন। খোরানিক মাদ্রাসা, বাড়ি, মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা তৈরির জন্য এই জমি উপহার করেন বলে জানা গেছে। উল্লেখ করা আবশ্যক মহারানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষে আগমন উপলক্ষে নবাব আলী আমজদ খানকে বৃটিশ সরকার সিলেটের শিক্ষানুরাগী ও জমিদার হিসাবে আমন্ত্রন করেন। সে সময়ে বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে সবচেয়ে স্বনামধন্য, শিক্ষানুরাগী, দানশীল জমিদার ছিলেন গৌছ আলী খানের পৌত্র নবাব আলী আমজদ খাঁন। এসময় তিনি সমাজসেবাসহ জমিদার হিসেবে সারা বাংলা এবং আসামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।

জমিদার পরিবার থেকে যারা জনপ্রতিনিধি ছিলেন :
পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির উত্তরসূরীদের মধ্যে ভারতবর্ষে আসাম প্রদেশের কৃষিমন্ত্রী ছিলেন নবাব আলী হায়দর খান। নবাব আলী আজগরের পুত্র নবাব আলী ইয়াহর খান পৃথিমপাশা ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর নবাব আলী হায়দর খানের পুত্র নবাব আলী ছফদর খান স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পৃথিমপাশা ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া ১৯৭০ এবং ১৯৭৩ সালে এমপি নির্বাচিত হন নবাব আলী হায়দরের কনিষ্ঠ পুত্র নবাব আলী সারওয়ার খান ওরফে চুন্নু নবাব। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণেতা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। এরপর নবাব পরিবার থেকে তিন বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নবাব আলী ছফদর খানের পুত্র নবাব আলী আব্বাছ খাঁন। তিনি ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদ, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ ও ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদে এমপি নির্বাচিত হয়ে কুলাউড়ায় চমক দেখান। তিনি বর্তমানে জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। আরেক ছেলে নবাব আলী নকী খান দুইবার পৃথিমপাশা ইউপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এবং বর্তমানে অপর ছেলে ভ্রাতা নবাব আলী বাকর খান হাসনাইন পৃথিমপাশা ইউপির চেয়ারম্যানের চলতি দায়িত্বে রয়েছেন।

পৃথিমপাশার ইমামবারা :
পৃথিমপাশার জমিদার পরিবার ছিল শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। তাই মসজিদের পাশেই রয়েছে ইমামবারা। ভারতীয় উপমহাদেশে ইমামবারাকে শিয়া সম্প্রদায়ের মহররমের শোক অনুষ্ঠান উদযাপনের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নবাব আলী আমজদ খাঁন এই ইমামবারাটি প্রতিষ্ঠা করেন। মহররমের দিন ইমামবারাকে কেন্দ্র করে কারবালার কাহিনী বর্ণনা, মর্শিয়া আবৃতি, শোক মিছিল ও মাতম চলে। জমিদারদের বর্তমান প্রজন্ম এখনও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহররম উপলক্ষে তাজিয়া মিছিল বের করে আশুরা পালন করে। এসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে।

পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির মসজিদ :
প্রায় তিনশত বছরের ঐতিহ্যকে ঘিরে রয়েছে প্রাচীনতম কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ি (নবাব বাড়ি) মসজিদ। কয়েকশত বছর থেকে শিয়া-সুন্নীর উভয় মাহজাবের অনুসারীরা সম্মিলিতভাবে নামাজ আদায় করেন এই মসজিদে। যার কারণে পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির এই মসজিদটি সম্প্রীতির এক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় প্রচার কাজের অংশ হিসেবে নবাব বাড়ির সম্মুখে শান বাধানো বিশাল দিঘীর পশ্চিম পাড়ে মুঘল ও পারস্যের স্থাপত্যের আদলে নির্মিত করা হয় মসজিদটি। তিন গম্বুজ বেষ্টিত এই মসজিদটিতে রয়েছে নানা কারুকার্য ও নান্দনিক স্থাপত্যে শিল্পের নিদর্শনের ছোঁয়া

সিলেটের বিখ্যাত আলী আমজদের ঘড়ি :
আলী আমজদের ঘড়ি সিলেট শহরে অবস্থিত ঊনবিংশ শতকের একটি স্থাপনা, যা মূলত একটি বিরাটাকায় ঘড়ি একটি ঘরের চূঁড়ায় স্থাপিত। যখন ঘড়ির অবাধ প্রচলন ছিল না, সেসময় ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের কীন ব্রীজের ডানপাশের্^ সুরমা নদীর তীরে এই ঐতিহাসিক ঘড়িটি নির্মাণ করেন পৃথিমপাশার জমিদার নবাব আলী আহমদ খান তাঁর ছেলে নবাব আলী আমজদের নামকরণে। পরবর্তীতে পিতার মৃত্যুর পর অসমাপ্ত ঘড়ির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ করেন নবাব আলী আমজদ খান।

জমিদার বাড়ির শান বাধানো দিঘীর ঘাট :
তিনটি ছোট-বড় শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে দীঘিতে। পশ্চিম পাড়ে জমিদার বাড়ির সারিবদ্ধ স্থাপনা আর পূর্বপাড়ে পরলোকগত পৃথিমপাশার সব জমিদার ও পরিবারের সদস্যদের কবরস্থান। এই দীঘির দু’পাড়ে হাজি খাঁ এবং শাহ ডিঙ্গির মাজার রয়েছে যা দেখতে অন্যান্য মাজারের চেয়ে আলাদা।

জমিদার বাড়িতে যারা এসেছিলেন :
মুঘল আমল থেকে অনেক জ্ঞানী গুণিরা পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন। এরমধ্যে ১৯৫১ সালে ইরানের রাজা রেজা শাহ পেহলভী অন্যতম। তাঁর সাথে ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পূর্ব-পাকিস্তানের সেনা প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান, পূর্ব-পাকিস্তানের গর্ভণর খাজা নাজিম উদ্দিন, প্রথম আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হিলব্রেক, ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুরসহ বহু ইংরেজসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামী কবি-সাহিত্যিকদের পদাপর্ণ বেশি ঘটে।

শিক্ষা-বিস্তারে অবদান :
তৎকালীন সময়ে নারী শিক্ষার প্রসারে মৌলভীবাজার জেলা শহরে ১৯০৫ সালে মৌলভীবাজার আলী আমজদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন নবাব আলী আমজদ খান। এছাড়া কুলাউড়ায় প্রতিষ্ঠা করা হয় আলী আমজদ স্কুল এন্ড কলেজ, রবিরবাজার দারুছুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসাসহ অসংখ্য স্কুল-কলেজসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা হয় নবাব পরিবার থেকে।

জমিদার বাড়ির বংশধরদের কথা :
জমিদার বাড়ির ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানতে কথা হয় জমিদারদের বর্তমান উত্তরসূরি ও সাবেক সংসদ সদস্য নবাব আলী আব্বাছ খান এবং তারই চাচাতো ভাই নবাবজাদা আলী ওয়াজেদ খান বাবুর সাথে।
নবাবজাদা আলী ওয়াজেদ খান বাবু বলেন, জমিদারি আমলে তাদের রাজস্ব আসতো ১১ লাখ টাকা। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পর এখন বাঁচার জন্য তাদের কাজ করতে হয়। ১৯৭১ সালে পাক বাহিনী আর ৮৩ সালে স্বৈরাচার বাহিনী বাড়িটি ধ্বংসের চেষ্টা চালায়। অপূরনীয় ক্ষতি হলেও পুরানো স্থাপত্য শিল্প আর অতীত ঐতিহ্যকে কোনমতে আকড়ে আছেন। তবে জীবিকায়নের জন্য ইংল্যান্ড আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন অনেকে। আমাদের পূর্বপুরুষরা খুবই ধার্মিক ছিলেন। এজন্য মানুষ এখনো তাদের শ্রদ্ধা করে। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তিতে ১০০ বিঘা জমি রেখে বাকিগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

পৃথিমপাশা নবাব বাড়ির ওয়াকফ ষ্টেইটের মোতাওয়াল্লী ও সাবেক সংসদ সদস্য নবাব আলী আব্বাছ খান বলেন, জমিদারী চলে গেলেও মানুষের কল্যাণে পূর্ব-পুরুষদের ন্যায় এ পরিবার কাজ করে যাচ্ছে। মানুষ এখনো আমাদের অনেক ভালোবাসে। বাপ-দাদারা যে সম্মান পেয়েছেন আমরা এখনো মানুষদের কাছ থেকে সেই সম্মান পাচ্ছি। জমিদারী না থাকলেও এই বাড়ির ঐতিহ্য ও ইতিহাস ধরে রাখতে পরিবারের পক্ষ থেকে যাবতীয় স্থাপনাসহ সবকিছু নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। বাড়িটি ঐতিহাসিক হওয়ায় নিয়মিত পর্যটকদের যাতায়াত রয়েছে এখানে।

সর্বশেষ সংবাদ