October 22, 2019

বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ হংকং-এর হালচাল

রায়হান আহমেদ তপাদার : আধুনিক বিশ্বের অন্যতম উন্নত এ ভূখন্ড এখন আন্দোলন-সংগ্রাম, ক্ষোভ-বিক্ষোভে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠেছে, মানুষ হংকং ছেড়ে চলে যেতে চাইছে। এ দ্বীপটা যেন চির অশান্তির এক ভূখন্ডে পরিণত হয়েছে। পুলিশের লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাসের তান্ডবে হংকংবাসীর জীবনের সর্বক্ষেত্রে নাভিশ্বাস ওঠেছে।
হংকংয়ের এ অবস্থার জন্য চীনা শাসনকেই দায়ি করছেন হংকংবাসী জনগণ। হংকংয়ের ইতিহাস থেকে দেখা যায়-এ দ্বীপটায় ১৮৪২ সালে বৃটিশ শাসন প্রবর্তিত হয়েছিলো এবং ১৯৯৭ সালে বৃটিশরাজ এ দ্বীপের কর্তৃত্ব গণচীনের হাতে তুলে দিয়েছিলো। ফলে এ দ্বীপে গণচীনের সার্বভৌমত্ব ও শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। তবে ১৯৯৭ সালে হংকং দ্বীপ চীনের হাতে তুলে দেবার সময় বৃটিশরাজ ও চীনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটা হস্তান্তর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো এবং এ চুক্তিতে কতকগুলো শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিলো, যাতে বলা হয়েছিলো ‘এক দেশ দুই নীতি’ অনুযায়ী হংকং দ্বীপ শাসিত হবে, এখানে বিদ্যমান বৃটিশ আইনই হবে হংকং শাসনের ভিত্তি।
চীনের সাথে হংকংয়ের রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ পার্থক্য; যেমন-ঐতিহাসিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও লাইফস্টাইল সহ নানাক্ষেত্রে পার্থক্য বিদ্যমান এবং এ কারণেই, চীনের সাথে হংকংয়ের সম্পর্ক জটিল। সম্পর্কের এই জটিলতার কারণেই হংকং শাসনের ক্ষেত্রে ‘এক দেশ-দুই নীতি’ পদ্ধতি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিলো। এই নীতিতে আরো বলা হয়েছিলো চারশ বর্গ মাইলের হংকং ভূখন্ডের সাত দশমিক দুই মিলিয়ন মানুষের আবাসভূমিতে তার প্রচলিত নিজস্ব আইন ও আর্থিক নীতি পদ্ধতি দ্বারা শাসিত হবে এবং এর জনগণ পূর্ণ সিভিল লিবার্টিজের অধিকার ভোগ করবে।

এবং আরো বলা হয়েছিলো যে, রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সর্বজনীন ভোটাধিকার নীতি প্রবর্তন করা হবে। হংকংয়ের গণতন্ত্র কিভাবে বিকশিত হবে, সেটা হংকংয়ের নিজস্ব বিষয় এবং হংকংয়ের জনগণই সেটা নির্ধারণ করবেন-বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করবে না, এমনটাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো চীনা কর্তৃপক্ষ এবং বেসিক আইনেও বলা হয়েছিলো হংকং হস্তান্তরের পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত চীন হংকংয়ের ওপর কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন সরকার তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে বলছে-হংকংয়ের ওপর বেইজিংয়ের সম্পূর্ণ এখতিয়ার আছে। আর বেইজিং সরকার ইতোমধ্যেই হংকংবাসীর সকল গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোসহ স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করছে বলে ওখানকার জনগণ অভিযোগ তুলেছেন। বিশ শতকের মধ্যভাগে নিষ্ফলা এ দ্বীপটাই হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির কেন্দ্ররূপে। বিশ্বের নানা অঞ্চলের বড় বড় বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা এ দ্বীপে এসে ভীড় জমান; গড়ে তুলেন আধুনিক শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ও পর্যটন কেন্দ্র। দ্বীপের বিমান বন্দরটা বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দর গুলোর অন্যতম ব্যস্ততম বিমানবন্দরের মর্যাদায় ওঠে আসে। এ সকল ব্যবসায়ীরা বিলিয়ন বিলিয়ন আমেরিকান ডলার বিনিয়োগ করেন হংকংয়ে, বিশ্বের বৃহৎ মাল্টিন্যাশনাল ট্রান্সন্যাশনাল কোম্পানীগুলো উড়ে আসে হংকংয়ে। ফলে এক সময়ের নিষ্ফলা দ্বীপটা বিশ শতকের মধ্যভাগে এসে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় আধুনিক অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক, সাংস্কৃতিক ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে ওঠে।

কিন্তু হংকংবাসীকে প্রতিহত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। আন্দোলন চলছে। ২০১৯ সালের মার্চ-এপ্রিল থেকে গড়ে ওঠা এবারের আন্দোলনের মূল ইস্যু ছিলো হংকং আইন পরিষদের প্রস্তাবিত হংকং প্রত্যর্পণ বিল ২০১৯ অর্থাৎ পলাতক অপরাধী এবং অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ক আইন (সংশোধন) বিল ২০১৯-এ পারস্পরিক আইনী সহায়তা সংক্রান্ত বিল। প্রস্তাবিত এ বিল হংকংয়ের বেসিক আইনের ও গণতান্ত্রিক স্বায়ত্ত শাসনের নীতির পরিপন্থী এবং হংকংয়ের স্বাধীন বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ বলে অভিযোগ তুলেন হংকংবাসী। বিশেষ করে, আইনজীবী সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন, ব্যবসায়িক সংগঠন এবং অনেক বিদেশী সরকারও আশংকা প্রকাশ করে প্রস্তাবিত বিলটা আইনে পরিণত হলে হংকংয়ের নিজস্ব আইনী ব্যবস্থা ও এর অন্তর্নিহিত সুরক্ষাগুলো ক্ষয় হওয়ার প্রবল আশংকা রয়েছে। তাই স্থানীয় ও বিদেশে এ বিলের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। হংকংয়ে প্রত্যর্পণের প্রস্তাবিত বিল বাতিলের দাবিতে আন্দোলন ও প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু হয়। এসব আন্দোলনে দশ লাখেরও অধিক হংকংবাসী রাজপথে নেমে এসে বিল বাতিল ও হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লামের পদত্যাগ দাবি করে। ১৫ জুন প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম প্রস্তাবিত বিল স্থগিত করবেন মর্মে ঘোষণা করেছিলেন কিন্তু আন্দোলনকারীরা বিলের পুরোপুরি প্রত্যাহার, সর্বজনীন ভোটাধিকার, পূর্ণ গণতন্ত্র এবং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। ক্যারি লাম বিল স্থগিতের ঘোষণা দিলেও আন্দোলনকারীরা লামের ঘোষণাকে আস্থায় নিতে পারেনি।

এছাড়া আন্দোলনকারীদের অভিমত, পুরোপুরি বাতিল বা প্রত্যাহার করা না হলে আন্দোলনকারীরা ঘরে ফিরে গেলে পুনরায় বিলটা আইনে পরিণত করা হতে পারে এবং সন্দেহ অবিশ্বাস থেকে আন্দোলনকারীরা বিল বাতিল না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরো কয়েকটা শর্ত জুড়ে দিয়ে আন্দোলন অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবার ঘোষণা দেয় এবং দেখা যায় মার্চ-এপ্রিল থেকে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ আন্দোলন এখন তীব্র গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। লক্ষ লক্ষ হংকংবাসী নেমে এসেছে রাজপথে। এই আন্দোলন তীব্র সহিংস আন্দোলনে মোড় নিয়েছে আন্দোলন কারীরা পাঁচটা দাবি তুলে ধরে সেগুলো অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত গণআন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষকে। বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে, বৃহত্তর গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও পরিপূর্ণ গণতন্ত্র কায়েম, প্রত্যর্পণ বিল প্রত্যাহার করা, হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লামের পদত্যাগ, আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশী বর্বরতার তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং গ্রেফতারকৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দান করা। প্রত্যর্পণ বিল প্রত্যাহারে সম্মত হলেও ক্যারি লাম অন্যান্য দাবিগুলো মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন। ফলে আন্দোলন আরো জোরদার ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠেছে এবং চীনা সরকার ও হংকংয়ের নির্বাহী লাম এ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী আন্দোলন বলে অভিহিত করে সেটা দমনের লক্ষ্যে তীব্র দমন নীতির আশ্রয় নিয়েছে হংকংয়ের পুলিশ। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্থাপনায় ভাংচুর করছে এবং হংকংয়ের কেন্দ্রস্থলে, বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা কেন বিমানবন্দরকে টার্গেট করলেন।

কিন্তু এমন প্রশ্নে বিক্ষোভকারীরা বলেন তাদের দাবি ও আন্দোলনকে সরাসরি বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাবার জন্য বিমানবন্দরকে টার্গেট করেছেন। এটা এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ততম বিমানবন্দর। হংকংয়ের এ বিমান বন্দরে বিশ্বের নানা দেশের যাত্রীরা আসেন। এসব যাত্রীদের নিকট ইংরেজী, ফরাসি. কোরিয়ান ও অন্যান্য ভাষায় লিখিত লিফলেট পৌঁছে দিয়ে আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরার পাশাপাশি, এ আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক করণের উদ্যোগ হিসেবেই বিমানবন্দরকে টার্গেট করে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভ কারীরা সাহায্য চেয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। হংকংয়ের মানুষের অধিকার রক্ষার আহবান জানিয়ে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, প্রস্তাবিত বিল কার্যকর হলে হংকংয়ের ভূখন্ডের ব্যক্তিদের মূল ভূখন্ড চীনে হস্তান্তরের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটা সমালোচক, মানবাধিকার রক্ষাকারী, সাংবাদিক, এনজিও কর্মী এবং হংকংয়ের অন্য যে কোনোও ব্যক্তিকে টার্গেট করার জন্য মূল ভূখন্ডের অর্থাৎ চীনা কর্তৃপক্ষের শক্তি ও ক্ষমতা প্রসারিত করবে। মূল ভূখন্ড চীনের বিচার ব্যবস্থায় নির্যাতন, ন্যায় বিচারের গুরুতর লঙ্ঘন, বলপূর্বক গুম করার ও বিনা বিচারে আটককরণের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যর্পণ আইনের ধারা হংকংয়ের নাগরিকদের উপরোক্ত অবস্থার মধ্যে পড়ার আশঙ্কা বিদ্যমান রয়েছে।বিবিসি সূত্র বলছে; যদি এ বিল পাস হয় তবে হংকং চীনের আরো একটা শহরে রূপান্তরিত হবে’ বলে ১৮ বছর বয়স্ক বিক্ষোভকারী মাইক মনে করেন। হংকংয়ের জনগণ বিশেষ করে যুব সম্প্রদায় চীনা শাসকদের প্রতি আস্থাশীল নয় কখনো। হংকংয়ের অধিবাসীরা অসন্তুষ্ট বর্তমান শাসনে।

১৯৯৭ সালে চীনের নিকট হংকংয়ের হস্তান্তরের সময়কালের ঘটনা স্মরণ করে হংকংয়ের যুব সম্প্রদায় আক্ষেপ করে বলে, আমরা আশা করেছিলাম হংকংয়ের প্রভাবে প্রভাবিত হবে মূল ভূখন্ড চীন; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে হংকংয়ের ওপর ক্রমাগতভাবে চীনের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়েই চলেছে এবং এ জন্য হংকংবাসীর মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে, সামনের দিনগুলো আরো অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। এই হতাশা ক্ষোভ-বিক্ষোভই হংকংবাসীকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে এবারের আন্দোলনে মিলিয়ন মিলিয়ন হংকংবাসী রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ জানাচ্ছে; ১২০টা স্কুলের হাজার হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থী হংকং সেন্টারে মিলিত হয়ে মানববন্ধন করেছে। এসবই হলো হংকংয়ের স্বকীয়তা, গণতন্ত্র ও স্বশাসন রক্ষার প্রত্যয়। তাই জয়ী না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। হংকং-চীনের নিকট হস্তান্তরিত হলেও হংকংয়ের একটা ‘ডিফেক্টো সংবিধান’ থাকবে, যা ‘হংকংবেসিক আইন’ নামে পরিচিত। বেসিক আইনের মূল ধারণা হলো হংকং চীনের অন্তর্ভূক্ত হলেও হংকংয়ের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে। হংকং সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে এবং বৃটিশরাজ প্রবর্তিত আইনের শাসন, বাক স্বাধীনতা, ব্যক্তির নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা, নিরপেক্ষ বেসামরিক প্রশাসন ও বিচার বিভাগসহ মৌলিক মূল্যবোধগুলো রক্ষা ও বহাল রাখা হবে। এদিকে, আন্দোলনকারীরা মনে করছে প্রত্যর্পণ বিল পাস হলে হংকং চীনা শাসনের আরো কাছাকাছি, এমনকি, চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে; হংকংয়ের গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এক দেশ-দুই নীতি প্রবর্তনের মূল কারণ ছিলো, মেইনল্যান্ড চীনের সাথে হংকং ভূখন্ডের মৌলিক ব্যবধান।
লেখক ও কলামিস্ট-raihan567@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ