October 22, 2019

হাকালুকিতে মরছে দেশি মাছ- মড়ক ঠেকাতে প্রশাসনের উদ্যোগ অপ্রতুল

মাহফুজ শাকিল, হাকালুকি থেকে ফিরে : হাকালুকি হাওর যেমন ধানের অপার সম্ভাবনাময় এলাকা তেমনি মাছেরও একই অভয়াশ্রম। এ হাওরের মাছের উৎস থেকে আশপাশের বিভিন্ন জেলার মাছের চাহিদা পূরণ হয়। অথচও মিঠা পানি নামে খ্যাত এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে বেশ কিছুদিন থেকে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ মরে ভেসে উঠছে। কিন্তুু প্রশাসনের দৃশ্যমান তেমন কোন উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। মড়ক ঠেকাতে যদি দ্রুত কোন উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে আবারো হাওরে দেখা দিতে পারে ২০১৭ সালের মত মহামারি।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অধিক তাপমাত্রায় আগাছা পচে পানিতে অ্যামেনিয়া গ্যাস বেড়ে যাওয়ার ফলে মাছ মড়কের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ২৮ হাজার হেক্টরবেষ্টিত এই হাওরে যত সামান্য জিওলাইট ও টিমসেন ছিটানো হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগন্য।
এর আগে ২০১৭ সালের এপ্রিলে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরের কাঁচা এবং আধা পাকা বোরো ধান তলিয়ে গিয়েছিল। তখন ধান পচে পানি দূষিত হয়ে পড়লে সাধারণ কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো। এতে হাওরের মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যায়।
স্থানীয় ও মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, হাকালুকি হাওরটি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২৮ হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত। সম্প্রতি হাওরের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা অংশের বিভিন্ন স্থানে নানা প্রজাতির ছোট-বড় মাছ মরে পানিতে ভেসে ওঠার খবরের সত্যতা পায় মৎস্য বিভাগ। এ অবস্থায় হাওরের পানির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে গৌড়কুড়ি, চকিয়া, ধলিয়া, নাগুয়া, কানলি এবং হাওয়াবন্যা বিলসহ এর আশপাশের এলাকায় ৫৮০ কেজি জিওলাইট ও ২০ কেজি টিমসেন ছিটিয়ে দেওয়া হয়।
সরেজমিনে সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেখা গেছে, হাওরের জুড়ী অংশের চাতলা ও নাগুয়া এবং কুলাউড়ার চকিয়া বিলের আশপাশে কিছু দেশি পুঁটি, রুই, কাতলা, ঘনিয়া, গুতুম, কঁই, বাইন ও ট্যাংরা মাছ মরে ভেসে উঠেছে।
চাতলা বিলের কাছে হাওরের ভাসান পানিতে বেড়জাল টেনে মাছ ধরছিলেন ১৫-২০ জন মৎস্যজীবী। তারা বললেন, সপ্তাহ খানেক সময় থেকে হাওরে মাছ মরছে। কি কারণে মাছ মরছে সেই কারণে তাঁদের জানা নেই।
কুলাউড়ার ভূকশিমইল এলাকার কৃষক আব্দুল কাদির বলেন, এ বছর ধান বিক্রি করে পারিশ্রমিকের অর্থই তুলতে পারিনি। মনে করেছিলাম মাছ ধরে ৫সদস্যের পরিবার পরিচালনা করবো এবং ধানে যে ক্ষতি হয়েছিল সেটা পুষিয়ে নিব। কিন্তুু তা হল না। আমি সবসময় চকিয়া বিলে মাছ ধরি। কিন্তুু গত কয়েকদিন আগে গিয়ে দেখি মাছগুলো মরে ভেসে উঠছে। যা আমাকে ও আমার পরিবারকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, এখন মা মাছের প্রজনন মৌসুম এবং পানিতে তারা যত নিরাপদে থাকে ততই প্রজনন ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। কিন্তুু অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে মারাত্মকভাবে মা মাছের স্বাস্থ্য হানি হতে পারে। এরজন্য সরকারের পক্ষ থেকে যদি দ্রুত কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয় তাহলে হাকালুকি হাওরে ২০১৭ সালে যে মহামারি আকার ধারণ করেছিলো তেমনি আবার হতে পারে। এজন্য সরকারকে দ্রুত প্রদক্ষেপ নিতে হবে।
কুলাউড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ বলেন, হাওরে মাছের মড়ক ঠেকাতে সরকারি কোন বরাদ্দ পাইনি। কিন্তুু নিজ উদ্যোগে হাওরের পানির গুণাগুন রক্ষায় জিওলাইট এবং দূষণ ঠেকাতে জীবানুনাশক টিমসেন যত সামান্য ছিটানো হয়েছে শুধুমাত্র কুলাউড়া অংশে। অন্য চারটি উপজেলায় মাছের মড়ক ঠেকাতে এখনো কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সর্বশেষ সংবাদ