September 19, 2019

আটকে যেতে পারে এমপিওভুক্তি

নিউজ ডেস্ক:: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির নীতিমালায় ডিগ্রি (স্নাতক) স্তরের যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্ধারণের ক্ষেত্রে নানা ত্রুটি রয়েছে। ডিগ্রি স্তরের এমপিও করার ক্ষেত্রে নীতিমালায় পরীক্ষার্থী ও পাসের হার উল্লেখ করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এমপিও প্রাপ্তির যোগ্যতা নির্ধারণে ১০০ নম্বরের গ্রেডিং হলেও ডিগ্রি স্তরের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৫০ নম্বরের গ্রেডিং করা হয়েছে।

গ্রেডিং পদ্ধতির এ অসঙ্গতির কারণে ডিগ্রি স্তরের অনেক যোগ্যপ্রতিষ্ঠান এমপিওর তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন অনেকে। তারা গ্রেডিং পদ্ধতির অসঙ্গতি দূর করে এমপিও ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে এমপিওভুক্তির তালিকা ঘোষণা করলে তারা আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে নয় বছর পরে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়াটি আটকে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাচাই কমিটির আহবায়ক জাবেদ আহমেদ বলেন, স্নাতক পর্যায়ে আলাদা কোনো জনবল কাঠামো নেই। যে কারণে শিক্ষার্থীর মতো পরীক্ষার্থীর ক্যাটাগরিতে স্নাতকের জন্য আলাদা পরীক্ষার্থী নির্ধারণ করা হয়নি। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান শুধু স্নাতক পর্যায়ে এমপিওভুক্তির আবেদন করছেন, তারা কেবল স্নাতকের শিক্ষার্থীর সংখ্যাটাই দিয়েছেন বলে আমি জানি এবং সেই আলোকেই গ্রেডিং করা হয়েছে। এতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলেও তিনি দাবি করেছেন। তবে নীতিমালায় কিছু টাইপিং ভুল এবং অসঙ্গতি আছে, সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সারাদেশে এমপিওভুক্তির আবেদন নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠানের বয়স ২৫ নম্বর, শিক্ষার্থীর সংখ্যার ক্ষেত্রে ২৫ নম্বর, পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৫ নম্বর এবং পাসের হারে ২৫ নম্বর করে মোট ১০০ নম্বরের গ্রেডিং করা হয়।

এমপিও নীতিমালা-২০১৮ তে এমপিওভুক্তির জন্য পাঁচটি স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। স্তরগুলো হলো, নিম্নমাধ্যমিক (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম), মাধ্যমিক (নবম থেকে ১০ম), উচ্চমাধ্যমিক (ষষ্ঠ থেকে ১২), কলেজ (১১ থেকে ১২), স্নাতক (পাস) তথা ডিগ্রি কলেজ (১১ থেকে ১৫)। পাঁচ স্তরের মধ্যে শেষ স্তরে অসঙ্গতি রয়েছে। ডিগ্রি স্তর মূলত; ১৩ থেকে ১৫ এ তিন শ্রেণি। নীতিমালায় ডিগ্রি স্তরের পরীক্ষার্থী ও পাসের হার ক্যাটাগরিতে কতজন শিক্ষার্থী থাকতে হবে, তা বলা হয়নি। এতে কতজন শিক্ষার্থী পাস করলে ওই প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য যোগ্য হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আদৌ স্নাতক পর্যায়ের পরীক্ষার্থী ও পাসের হার গ্রেডিং হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, এমপিও নীতিমালার পরিশিষ্ট ‘খ’তে একাদশ-দ্বাদশ এ দুই শ্রেণিতে মফস্বলে ১৫০ জন এবং স্নাতক পর্যায়ে তিনটি শ্রেণিতে ৫০ জন ন্যূনতম শিক্ষার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু পরিশিষ্ট ‘গ’ অনুচ্ছেদে একাদশ থেকে ১৫ অর্থাৎ পাঁচ শ্রেণিতে কতজন পরীক্ষার্থী থাকবে, তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।

নির্ধারণ করা হয়েছে একাদশ থেকে ১৫ শ্রেণি পর্যন্ত। এ পাঁচ শ্রেণিতে ৪০ পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ৪০ জন কোন স্তরের পরীক্ষার্থী, তা-ও নির্ধারণ হয়নি। ফলে গ্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে ডিগ্রি স্তরের পরীক্ষার্থী ও পাসের মূল্যায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ যারা শুধু ডিগ্রি স্তরের এমপিওর জন্য আবেদন করেছেন, তাদের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কীভাবে মূল্যায়ন হবে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত উচ্চমাধ্যমিক কলেজ (একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি) এমপিওভুক্তির পরে এসব প্রতিষ্ঠানে ডিগ্রি স্তর খোলা হয়। এবার তারা ডিগ্রি স্তরের এমপিওভুক্তির আবেদন করেছেন। কিন্তু ডিগ্রি স্তরের পরীক্ষার্থী ও কতজন শিক্ষার্থী পাস করতে হবে, তা নীতিমালায় উল্লেখ নেই। ফলে এ স্তরের প্রতিষ্ঠান ১০০ নম্বরের মধ্যে ৫০ নম্বরের গ্রেডিং হয়েছে বলে মনে করেন তারা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এমপিওভুক্তির যোগ্য প্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে ডিগ্রি স্তরের প্রতিষ্ঠান বাদ পড়েছে। কারণ গ্রেডিং নির্ধারণ করা হয়েছে অটোমেশন বা সফটওয়্যারের মাধ্যমে।

এমপিওভুক্তির বাছাই কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নীতিমালার অসঙ্গতির এ বিষয়টি শেষ সময়ে এসে ধরা পড়েছে। অনেকেই অভিযোগও করেছেন। কিন্তু তালিকা চূড়ান্ত হওয়ায় এখন সংশোধন করতে গেলে ব্যাপক তোলপাড় হবে। মামলা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত পুরো এমপিও প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারে। এ আশঙ্কা থেকে আপাতত এটা চাপা দিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, মামলা জটিলতা এড়াতে স্তরভিত্তিক এমপিওর প্রজ্ঞাপন জারির চিন্তাভাবনা চলছে। যাতে ডিগ্রি স্তরের বঞ্চিতরা মামলা করলেও অন্যস্তরের এমপিও দেওয়া যায়।

নীতিমালায় কাম্য শিক্ষার্থীর ক্যাটাগরিতে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। নিম্নমাধ্যমিক (শহরের প্রতিষ্ঠানে ২০০ শিক্ষার্থী ও মফস্বলে ১৫০ শিক্ষার্থী), মাধ্যমিকে (শহরে ৩০০, মফস্বলে ২০০), উচ্চমাধ্যমিকে (শহরে ৪৫০ মফস্বলে ৩২০), কলেজ পর্যায়ে উচ্চমাধ্যমিক একাদশ-দ্বাদশ (শহরে ২০০ ও মফস্বলে ১৫০)। স্নাতক (পাস) পর্যায়ে ২৫০ (একাদশ-দ্বাদশে ২০০, স্নাতকে ৫০ জন)।

কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল ক্যাটাগরিতে স্নাতক পর্যায়ে কতজন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে, তা উল্লেখ নেই। স্নাতক ক্যাটাগরিতে একাদশ-দ্বাদশ ও স্নাতক পর্যায়ে মোট পাঁচটি শ্রেণির পরীক্ষার্থী একসঙ্গে শহরে ৬০ জন এবং মফস্বলে ৪০ জন নির্ধারণ করা হয়েছে।

জানা গেছে, এমপিও নীতিমালা ২০১৮ আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে গ্রেডিং করা হয়েছে। চারটি ক্যাটাগরিতে ১০০ নম্বরের গ্রেডিংয়ের ওপর ভিত্তি করে ১৭৬৩টি প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পেলেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, একাডেমিক স্বীকৃতিতে ২৫ নম্বর (প্রতি দুই বছরের জন্য পাঁচ নম্বর, অর্থাৎ ১০ বা তার চেয়ে বেশি বয়স এমন প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৫ নম্বর)। শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর ২৫ নম্বর (কাম্য সংখ্যার জন্য ১৫ নম্বর। এরপর ১০ শতাংশ বৃদ্ধিতে পাঁচ নম্বর)। পরীক্ষার্থীর সংখ্যার জন্য ২৫ নম্বর (কাম্য সংখ্যার ক্ষেত্রে ১৫ ও পরবর্তী প্রতি ১০ জনের জন্য পাঁচ নম্বর)। পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের জন্য ২৫ নম্বরের (কাম্য হার অর্জনে ১৫ নম্বর ও পরবর্তী প্রতি ১০ শতাংশ পাসে পাঁচ নম্বর) গ্রেডিং করা নম্বর নির্ধারিত আছে।

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেয়। এরপর যাচাই-বাছাই ও আবেদন গ্রহণের জন্য আলাদা দুটি কমিটি করে দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) জাবেদ আহমেদের নেতৃত্বে গঠন করা হয় নয় সদস্যের ‘প্রতিষ্ঠান বাছাই কমিটি’। অন্যদিকে অনলাইনে আবেদন গ্রহণের জন্য ব্যানবেইসের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহর নেতৃত্বে গঠন করা হয় আট সদস্যের কারিগরি কমিটি। এ কমিটিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট, প্রোগ্রামারসহ বিশেষজ্ঞদের কমিটির সদস্য করা হয়। তার সফটওয়্যার তৈরি করে দেন। এরপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়।

সর্বশেষ সংবাদ