December 11, 2019

তথ্যপ্রযুক্তির আসক্তি রোধে সচেতনতার বিকল্প নেই

রায়হান আহমেদ তপাদার : বর্তমান সময়ে আপনার হাতেও একটি মোবাইল ফোন থাকাটা স্বাভাবিক। তবে আপনার মোবাইল ফোনের সাথে যদি নিজেকে মানসিকভাবে জড়িয়ে ফেলেন তাহলে ব্যাপারটা আর স্বাভাবিক থাকে না। মোবাইল ফোনের সাথে এর ব্যবহারকারীর এই যে অতিমাত্রায় মানসিক সংযোগ, মানসিক চিকিৎসকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘নোমোফোবিয়া’। নোমোফোবিয়া শব্দটি এসেছে নো, মো এবং ফোবিয়া থেকে। যেটাকে একসাথে করলে হয় মোবাইল ফোন নেই এমন ফোবিয়া। বর্তমানে পৃথিবীতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সাধারণ মোবাইল ফোনের পাশাপাশি বেড়ে চলেছে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যাও। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণানুসারে, বর্তমানে শুধু আমেরিকার মোট জনসংখ্যারই ৯০ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, যাদের ৫০ শতাংশ হল স্মার্টফোন ব্যবহারকারী। এছাড়া পৃথিবীতে প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন মোবাইল ফোন গ্রাহক রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক তো খুব সাধারণ একটি অ্যাপ। আর দশটা অ্যাপের মত। কিন্তু বর্তমানে ফেসবুক ছাড়া আমাদের একটা মিনিটও চলে না। কোনো অ্যাপ নয়, এটি যেন আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। ঠিক একইভাবে, মোবাইল ছাড়াও বর্তমানে মানুষ নিজের জীবনকে ভাবতে পারে না। মোবাইল কাছে নেই বা মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছে- এটাও অনেকের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। বর্তমান যুগে আমরা সবাই মুঠোফোন বা মোবাইলে আসক্ত থাকি। দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২২ ঘণ্টাই এই যন্ত্র নিয়ে পড়ে থাকি। যার কারণে পরিবার-আত্মীয়স্বজন থেকে আমাদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়।

আমাদের একটি নতুন জগৎ তৈরি হয়ে যায়, যা আমাদের শরীর-মনকে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেক চেষ্টা করেও আমরা মোবাইল ফোনে আসক্তি থেকে বের হতে পারি না।জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী প্রতিদিন ১ লাখ ৭৫ হাজার শিশু নতুনভাবে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কম্পিউটার, টিভি ও মোবাইল ফোন আমাদের যাপিত জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে জীবনের সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আমাদের শিশুরাও যুক্ত হচ্ছে কম্পিউটার, টিভি, মোবাইল ট্যাবের সঙ্গে। কিন্তু অতি আসক্তির কারণে তাদের এক বড় অংশ সর্বনাশের শিকারও হচ্ছে। শুধু দৃষ্টিশক্তির সমস্যা নয়, নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যারও শিকার হচ্ছে তারা। এ বিপজ্জনক ধারা থেকে শিশুদের রক্ষায় বাবা-মাদের সতর্ক হতে হবে। তাদের শিশু যাতে কম্পিউটার বা মোবাইল আসক্তি নামের সর্বনাশের দিকে পা না বাড়ায়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। কম্পিউটার, টিভি ও মোবাইল ট্যাব শিশুদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিচ্ছে। দুনিয়াজুড়ে লাখ লাখ শিশু ভুগছে দৃষ্টিশক্তির সমস্যায়। বাংলাদেশেও এটি আগ্রাসী থাবা বিস্তার করছে। ক্ষীণদৃষ্টিকে একসময় ভাবা হতো প্রবীণদের সমস্যা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষমতাও হারায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ফলে বয়স বাড়লে অন্তত চল্লিশের ওপর গেলে অনেকেই আক্রান্ত হয় ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যায়। কম বয়সিদের ক্ষেত্রে ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা যে ছিল না, এটি হলফ করে বলা যাবে না। তবে সে সংখ্যা ছিল নগণ্য এবং এর কারণ ছিল প্রধানত অপুষ্টি। কালের বিবর্তনে দেশে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা কমছে। কিন্তু ভয়াবহভাবে বাড়ছে ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা।

যে সমস্যার পেছনে অপুষ্টি নয়, বরং দায়ী তথ্যপ্রযুক্তি আসক্তি। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনে আসক্তি শিশুর দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিচ্ছেÑ এমন তথ্যই জানিয়েছেন চোখের চিকিৎসায় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা। তারা শিশুদের চোখের সমস্যার তিনটি কারণের কথা বলেছেন। এর মধ্যে কোনো কোনো শিশু চোখে সমস্যা নিয়েই জন্মায়। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে শিশু রাতকানা রোগে ভুগতে পারে, এমনকি অন্ধও হয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত. স্ক্রিনের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার কারণে শিশুরা চশমা ছাড়া দূরের জিনিস দেখতে পায় না। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে মাসে গড়ে সাড়ে ৩ হাজার শিশু আসে। এর ৭০ শতাংশ দূরের জিনিস ভালো দেখতে পায় না। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর তথ্যও অভিন্ন। ডাক্তারি ভাষায় রোগটিকে বলা হয় ‘মাইয়োপিয়া’ বা ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা। একই সঙ্গে এ রোগকে বলা হচ্ছে ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম’।
মোবাইলের আসক্তি কমাতে করণীয় হচ্ছে নিজের মনকে স্থির করতে হবে এবং বলতে হবে আমি আমার মোবাইল ফোনটি প্রতিদিন এক ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করব না এবং কোনোভাবেই এই চিন্তার বাইরে যাওয়া যাবে না। খুব বেশি জরুরি প্রয়োজন না হলে মোবাইল ফোনটি একেবারে কাছে রাখার দরকার নেই। শুয়ে-বসে হাত বাড়ালেই ফোনটি পাবেন, আসক্তি দূর করতে চাইলে এমন নৈকট্য পরিহার করুন। প্রিয় ফোনটি দূরে রেখে এবার প্রিয় বইটি কাছে এনে রাখুন। হাত বাড়ালেই হয়তো ফোনটি পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু বইটি তো রয়েছে! এভাবেই অভ্যাস ভাঙার চেয়ে বেশি কাজে লাগবে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা। হতেই পারে বই আপনার পছন্দের নয়।

কিন্তু এমন অনেক জিনিস আছে আপনার পছন্দের, মোবাইল ফোনটি দূরে সরিয়ে এবার তাদের সঙ্গে সময় কাটান। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা চাইলেও মোবাইল থেকে দূরে থাকতে পারি না। কিন্তু নিজের সুস্থতার জন্য হলেও মোবাইলে আসক্ত হওয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করার মাঝে লুকিয়ে আছে দৃষ্টিশক্তি রক্ষার মহৌষধ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যে প্রযুক্তিগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তার মধ্যে স্মার্টফোন অন্যতম। এটি যেমন দরকারি, তেমনি এর প্রতি আসক্তি আপনার সন্তানকে নানা বিপদে ফেলছে। স্মার্টফোনে আসক্তি এখন পরিবার ও সামাজিক পরিসর, এমনকি কর্মক্ষেত্রেও সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আড্ডা তো বটেই, কাজের আলাপের সময়ও কারও কারও চোখ পড়ে থাকে স্মার্টফোনে! চারপাশে কী হচ্ছে, সেসবে যেন খেয়াল করেন না তাঁরা। প্রাত্যহিক কিছু চর্চার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এই স্মার্টফোনে আসক্তি কমিয়ে আনা সম্ভব। এ বিষয়ে সিএনএন অবলম্বনে এক চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোনের এই আসক্তি অনেকটাই সংক্রামক। কোনো ঘরে বা কোনো আড্ডায় কেউ একজন হাতে স্মার্টফোন তুলে নিলে দ্রুতই অন্যরাও একে একে হাতে নিয়ে তাতে নজর বুলাতে শুরু করেন। চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ক্যাথেরিন স্টাইনার-অ্যাডায়ার সিএনএনকে বলেন, অনেক মানুষেরই কিছুক্ষণ পরপর স্মার্টফোন চেক করার বাতিক আছে। প্রতিটি নোটিফিকেশন, লাইক, কমেন্ট এসব যেন তাঁদের মস্তিষ্কে একটা আনন্দ সংবাদের মতো প্রতিক্রিয়া করে এবং তাঁরা উদগ্রীব হয়ে ফোন দেখতে শুরু করেন।

বর্তমান সময়ে একদিকে মোবাইল ফোন যেমন আমাদের অনেক বেশি প্রয়োজন অন্যদিকে মোবাইলের প্রতি আসক্তি আজ সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ। শিশুদের মোবাইল আসক্তি থেকে মুক্ত করার এখনি সময় তাদেরকে মোবাইল থেকে দূরে রাখা। এজন্য পিতামাতাকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পিতামাতাসহ পরিবারের সকলকে সচেতন হতে হবে। স্মার্টফোনের আসক্তির কারণে দেখা যায় যখন একজন শিক্ষার্থী পড়তে বসেন তার মনোযোগ পড়ার চেয়ে ফোনের দিকে বেশি থাকে। ফলে পড়ালেখা বা নতুন উদ্ভাবনী চিন্তাশীলতাও কেড়ে নিচ্ছে মোবাইল আসক্তি। অনেক সময় দেখা যায় মোবাইল আসক্তির কারণে সম্পর্কের মধ্যেও ভাটা পড়তে থাকে। একই সঙ্গে বসে বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছে কিন্তু সকলের মনোযোগ যার যার স্মার্টফোনের দিকে। স্মার্টফোনের আসক্তির কারণে অনেক রাত জেগে ঘুমাতে যাওয়ার ফলে একজন মানুষের যে পরিমাণ ঘুমের প্রয়োজন অনেক সময় দেখা যায় সেটাও হয়ে ওঠে না। ফলে এখনি আমাদের উচিত মোবাইল আসক্তির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণের। যাতে করে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম এই ভয়াবহতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে।
লেখক ও কলামিস্ট-raihan567@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ