June 17, 2019

ডিল আর নো ডিল দ্বন্দ্বে ব্রিটেন ক্ষয়ে গেছে

­­­রায়হান আহমেদ তপাদার : গত ২৪ মে এক আবেগঘন বক্তব্যে আগামী ৭ জুন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এর আগে তিনি যে কয়বার খসড়া চুক্তি হাউস অব কমন্সে পেশ করেছিলেন, প্রতিবারই তার নিজের দল কনজারভেটিভ পার্টিসহ বিরোধী লেবার এবং অপরাপর সবার তোপের মুখে পড়তে হয়। কারণ তিনি যে চুক্তিটি পাস করিয়ে নিতে চাইছেন,এর মধ্য দিয়ে ইইউর কাছে ব্রিটেন অনেকটা নিজেকে সঁপে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বহুল আলোচিত ‘ডিভোর্স বিল’ চুক্তির যে খসড়া মে সরকার এবং ইইউ মিলে তৈরি করেছে, সেখানে এই বিচ্ছেদ পুরোপুরি কার্যকর করতে ২১ মাস সময় ধরা হয়েছে এবং পরবর্তীকালে তা আরও দুই বছর বৃদ্ধি করার বিষয় যুক্ত রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাজ্যের জন্য ইইউর সব আইন (ভবিষ্যতের পরিবর্তনযোগ্য আইনসহ) মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা সংস্থাটির সদস্যপদ চিরতরে হারাবে। ব্রিটেনের দুরবস্থাকে একেক রাজনীতিক ধারা একেকভাবে পুঁজি করে নেমেছে। অনেকটা আমাদের দেশেরই মতো, এরা দেশের ভবিষ্যৎ নয় নিজেরা ক্ষমতায় যাবে কীভাবে-আর সাধারণ মানুষদের যা বোঝালে তা আয়ত্ত করা যাবে সেটাই তাদের কথা। কখনো ধর্ম, কখনো মিথ্যাচার আবার কখনো বৃহত্তর মানবতার দোহাই দিয়ে তাই চলছে। বিগত ৩০ বছর আমার দেখা ও অভিজ্ঞতায় ধারণা হয়েছে, গণতন্ত্রের কথা বললেও এ দেশের আসল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রকের বনেদি বিত্তবান ও এলিট ক্লাস। আর তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা বাস্তবায়ন করছেন তাদেরই বন্ধুবান্ধব ইটন শিক্ষিত রাজনীতিকেরা।  দিনকে দিন তাই ধনীরা আরও বিত্তবান হয়েছেন। তাহলে শতকরা ৫১ ভাগ হ্যাঁ’ ভোট দিল কি শুধু তারাই? না, কথায় আছে ‘ওল্ড ইমিগ্রান্ট হেইটস নিউ ইমিগ্রান্ট। এরা সাধারণের মনে সেই ভয়ের পেছনে লাগিয়েছে ধোঁয়া। তাতে আগুন লেগে তাদের ঘর পুড়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে এখন তারা নিজেদের আঙুল কামড়াচ্ছেন। যেসব রাজনীতিক ইউরোপ ছাড়ার জন্য উল্লম্ফন করেছিলেন, তাঁরা এবং সাংসদেরা তো দফায় দফায় তেরেসা মের অনাস্থা প্রকাশ করে তাঁকে চেয়ারচ্যুত করে দিলেন। নিয়মানুযায়ী গত মার্চ মাসে ইইউয়ের সঙ্গে সব চুকেবুকে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে সে তারিখ অক্টোবরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে কোনো কল্যাণ হচ্ছে না দেশের। ব্যবসাপাতি সব আটকে আছে। ইউরোপের কেউ আসছেন না। অবস্থাদৃষ্টে মহাকবি কালিদাসের কুমার-সম্ভবত কাব্যের পঞ্চম সর্গের একটি শ্লোকের শেষাংশ ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’র কথা মনে হলো অর্থাৎ ত্রিশঙ্কু অবস্থা। নো ডিল’ আর ডিল উভয়ই জটিল হয়ে গেছে। খালি হাতে এই পরিবারবিচ্ছেদ থেকে মুক্তি চাইলেও গচ্চা দিতে হবে। গত তিন বছরে ব্রিটেন একেবারে ক্ষয়ে গেছে। ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটেন সত্যি সত্যি গ্যাঁড়াকলে পড়েছে। সেদিন ছেলেটি যা যা বলেনি, এই তিন বছরে তাও হলো। এখন লন্ডনের পথে পথে ত্রিগুণ গৃহহীন ও ভাসমান মানুষ এবং এরা ভিন দেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুও না। এরা ককেশিয়ান এবং লন্ডনার। দ্রব্যমূল্যও এমন বেড়েছে যে আগে সুপার স্টোর থেকে কয়েকটা অগায়রা–মগায়রা মিলে বিশ পাউন্ডে যা কেনা যেত, এখন তা কিনতে লাগে ২২ বা ২৩ পাউন্ড। বাড়েনি বেতন কিন্তু চাকরিচ্যুতি হয়েছে হাজার হাজার।  অপরদিকে জিরো আওয়ার কন্ট্রাক্টে কাজ বেড়ে গেছে। অর্থাৎ ছাঁটাই হলে কোম্পানির কোনো দায় দায়িত্ব থাকছে না। কম মানসম্পন্ন ও কমদামি জিনিসে বাজার ভরে গেছে। ছোট ছোট পারিবারিক ব্যবসা আর নেই বললেই চলে। কর্নার শপ যা ছিল বিলেতের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটি, তা উঠে গেছে। হলিডে ব্যবসা অর্ধেকে নেমে এসেছে, অন্ধকার হয়ে এসেছে ক্রিসমাসের আলোকমালা। এদিকে আরেক কাণ্ড বেধে উঠেছে এ দেশে সরকারি আমন্ত্রণে আসা আমেরিকার অদূরদর্শী, বাচাল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পকে নিয়ে। প্লেন মাটি ছোঁয়ার আগেই তিনি টুইটারে চূড়ান্ত অবমাননামূলক মন্তব্য ছুড়ে দিলেন লন্ডন মেয়র সাদিক খানের প্রতি। আর নেমেই মাত্র হয়ে যাওয়া ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের নির্বাচনে ব্রেক্সিট পার্টি’ নামে নতুন দল বানিয়ে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাওয়া সাবেক ইউকিপ নেতা, চূড়ান্ত বর্ণবাদী ও ইউরোপ বিদ্বেষী নাইজেল ফারাজ সম্পর্কে দুম করে বলে বসলেন, ইইউয়ের সঙ্গে দর-কষাকষি করার জন্য তাঁকেই পাঠানো উচিত। আরও বললেন, বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রীর জন্য যোগ্য ব্যক্তি। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাঁর কিছু বলা উচিত না হলেও তাঁকে থামায় কে? বলে মন্তব্য করেছেন। আর ইউরোপ হারিয়ে থেরেসা মে এখন আমেরিকার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে তুলবার ও নতুন চুক্তি করবার জন্য মরিয়া। হায়, কোথায় ঘরের মানুষ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো আর কোথায় সেই আটলান্টিকের ওপারের অদ্ভুত দেশ আমেরিকা! এখন তাদের মুরগি খেয়ে সে দেশের মানুষের মতো অবিস হওয়া বাকি!  যেকোনো জরিপ ফলাফল নিয়ে অ্যারিস্টটলের একটা কথা আছে, যা অনেকটা এ রকম, যখন পক্ষে-বিপক্ষে ব্যবধান হবে ন্যূনতম হ্যাঁ ৫১% না ৪৯%, তখন তার ফলকে গণতান্ত্রিক বলে কাজে লাগানো ঠিক হবে না। কিন্তু সেটা তো হলোই না; উপরন্তু এই ফলাফলের কোনো বাধ্য বাধকতা না থাকলেও কেবল ক্ষমতায় থাকার জন্যই লাফিয়ে এসে থেরেসা মে এসে বললেন, ব্রেক্সিট মিনস ব্রেক্সিট’। ব্যস, পেয়ে গেলেন প্রাচীনপন্থী বুড়োদের ও কুবেরদের সমর্থন। কিন্তু দিলেন পুরো ইউরোপকে খেপিয়ে। যে তরুণসমাজ ভোট দিতে যায় না, তারা বুঝল, এ তাদের ভবিষ্যতে ছুরি মারা হয়েছে। প্রতিবাদে প্রতিবাদে ওয়েস্ট মিনস্টার ছেয়ে গেল। তাতেই এই ঘষ্টাঘষ্টি আর দেরি। আর এখন দেখছি, একসময়ের রাজা ব্রিটেনের ভিখারি হওয়ার দশা। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লৌহমানবী আশির দশকে তাঁর আমলে সুদূর আর্জেন্টিনায় ফকল্যান্ড যুদ্ধ বাধিয়ে আর্জেন্টিনাকে জন্মের মতো ব্রিটেনবিদ্বেষী বানিয়েছেন। আর রক্ষণশীল দলের আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ব্রেক্সিটের জন্য গণভোটের ব্যবস্থা করে ও পরে তাঁর স্থলাভিষিক্ত প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ব্রেক্সিট নিয়ে ক্ষমতাসীন টোরিরা করলেন আমাদের বৃহত্তর গৃহচ্যুত। এখন আমেরিকার মুখাপেক্ষী হয়ে আমাদের হয়তো বাকি জীবন তাদের উচ্ছিষ্ট খেতে হবে, তাদের কারণে আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্য খাত বেহাত হয়ে ব্যক্তিগত ব্যবসা হয়ে ছারখার হয়ে যাবে। বলেন, ঘরের মধ্যে ঝগড়া করে কোন বুদ্ধিমান? সদ্য পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দর-কষাকষির অনমনীয় ও শক্ত আচরণকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ।  উল্লেখ্য পাঁচ শতাধিক স্কুল অভিযোগ এনেছে তিনি শিক্ষা খাতের বাজেট রিব্যালেন্স করার নামে কর্মচারী বরখাস্ত, ক্রস কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি বাতিল করে পাঠ্য বিষয় সীমিতকরণ থেকে একই ক্লাসে ঠেসে ঠেসে স্থানের অধিক ছাত্রছাত্রী ঢোকাতে বাধ্য করে তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরাক আগ্রাসনের জন্য সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার যেমন ইরাকের বিরুদ্ধে একেবারে ডাহা বানোয়াট তথ্য দিয়েছিলেন, এবার ব্রেক্সিটের জন্য তা করেছেন কট্টর ব্রেক্সিট–সমর্থক পার্লামেন্ট সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনও। এই মিথ্যাচারের জন্য অতি সম্প্রতি ইউরোপিয়ান কোর্ট তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতে কী! সাধারণ মানুষের যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে বারবার ব্যর্থ হয়ে বেশ চাপের মুখে রয়েছেন থেরেসা মে। যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের ব্যাপারে তাঁর নতুন পরিকল্পনা মন্ত্রিসভায় ও পার্লামেন্টে অনুমোদিত না হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরই পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন থেরেসা মে। আগামী ৩১ অক্টোবর ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করার তারিখ নির্ধারিত থাকলেও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি দেশটির পার্লামেন্ট। অবশেষে যেই কথা সেই কাজ। পদত্যাগ করলেন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। আর পদত্যাগের পর তিনি গণমাধ্যমের সামনে আসলেন শেষ বক্তব্য নিয়ে, যেখানে তিনি নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। কাঁদলেন অঝোরে। বিবিসির রাজনীতিবিষয়ক সম্পাদক লরা কুয়েন্সবার্গ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে খুশি করতে গিয়ে কাউকেই খুশি করতে পারলেন না। পরিস্থিতি সামাল দিতে মে যখন বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের সমর্থন চাইলেন চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য, এটাকে লেবার পার্টির কাছে নিজেদের সঁপে দেওয়া হিসেবে উলেল্গখ করেছেন অনেকেই। এ ক্ষেত্রে মে যখন বিকল্প সমাধান হিসেবে আরেকটি গণভোটের চিন্তাভাবনা মাথায় রেখেছেন, সেটিকেও হতে দিতে চাইছেন না দলের অনেকেই। সুতরাং সার্বিক পরিস্থিতি জাতীয় প্রয়োজন নয়, অসুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতারই একটি নেতিবাচক ফল হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমরা যদি ধরে নিই যে, নতুন যিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, তিনিও কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প হাজির করতে পারলেন না এবং এই অবস্থায় কোনো চুক্তি ব্যতিরেকেই ব্রিটেন ইইউ থেকে বের হয়ে গেল, তাহলে ক্ষতির মাত্রা কার কতটুকু হবে, সেটা সহজেই অনুমেয়।

 লেখক ও কলামিস্ট-raihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ