August 24, 2019

ধর্ষণ চেষ্ঠায় বাধা দেওয়ায় প্রবাসীর স্ত্রীকে প্রকাশ্যে লাঠিপেঠা, ভিডিও ভাইরাল

কুলাউড়া প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় তিন সন্তানের জননী প্রবাসীর স্ত্রীকে (৩৫) একই ইউনিয়নের মোলাইম খান নামে এক ব্যক্তি (৪৫) প্রায় সময়ই উত্ত্যক্ত ও শ্লীলতাহানির চেষ্ঠা করতেন। সম্প্রতি তিনি ওই গৃহবধুর বসতঘরে ঢুকে তাঁকে ধর্ষণের জোর প্রচেষ্ঠা চালান। এতে বাঁধা দেওয়ায় গৃহবধুকে কে অর্ধনগ্ন করে প্রকাশ্যে লাঠিপেঠা ও শারিরীকি নির্যাতনের করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে কুলাউড়া থানায় মামলা করেছেন ওই গৃহবধু। মামলার প্রেক্ষিতে শুক্রবার রাতে কুলাউড়া থানা পুলিশ নির্যাতনকারী মোলাইম খানকে গ্রেফতার করেছে।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে ১৩ মে ঘটনাটি ঘটেছে। গৃহবধুর বাড়ি বরমচাল ইউনিয়নের একটি গ্রামে। তাঁর স্বামী প্রবাসে থাকেন এবং তিনি তিন কন্যার জননী। বড় কন্যার কিছুদিন আগে বিয়ে দেওয়া হয়। বাড়িতে ওই নারী তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। মোলায়েম খান একই ইউনিয়নের রাউৎগাঁও উজানপাড়া গ্রামের মৃত সরল খানের পুত্র মোলাইম খান। গৃহবধুর বাড়ি ও মোলাইম খানের বাড়ি পাশাপাশি গ্রামে। গত ১৩ মে সোমবার গৃহবধুর স্বামী বিদেশ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ‘বিকাশ’ এজেন্টের মাধ্যমে তাঁর কাছে নগদ পাঁচ হাজার টাকা পাঠান। ওইদিন দুপুরে স্থানীয় ফুলেরতল বাজারের একটি দোকান থেকে টাকা উত্তোলন করে গৃহবধু বাড়িতে ফেরেন। এসময় ওই গৃহবধুর পিছু ধরে মোলাইম খান তাঁর ঘরে ঢুকে তাঁকে ধর্ষণের চেষ্ঠা চালান। বাধা দেওয়ায় তাঁর সম্পর্কে নানা অপবাদ তুলে প্রবাসীর স্ত্রীকে মারধর করে ঘর থেকে বের করে আনেন। পরে ওই গৃহবধুর দুই মেয়ের সামনে অর্ধনগ্ন করে প্রকাশ্যে বেধড়ক লাঠিপেঠা করেন মোলাইম খান। গৃহবধুর দুই মেয়ে তাঁকে রক্ষায় এগিয়ে এলে মোলায়েম তাদেরও বিভিন্ন হুমকি দেন। বেধড়ক মারধরের একপর্যায়ে গৃহবধু অচেতন হয়ে পড়লে মোলায়েম ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পরে গৃহবধুর আত্মীয়স্বজনরা তাঁকে আহত অবস্থায় প্রথমে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে পরে কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
গৃহবধুকে প্রকাশ্যে মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চাউর হলে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। বৃহস্পতিবার রাতে গৃহবধু বাদী হয়ে মোলায়েমকে আসামী করে নারী নির্যাতন ও দন্ডবিধি আইনে মামলা দায়ের করেন। চিকিৎসায় সময় লাগায় মামলা করতে দেরি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, মোলাইম খান ওই গৃহবধুকে নিজের বিবাহিত স্ত্রী দাবি করছেন ও স্ত্রীর আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে মারধর করেছেন বলে দাবি করেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধু বলেন, ‘আমার শ্বশুর, শাশুড়ি মারা গেছেন। ভাসুর (স্বামীর বড় ভাই) অন্যত্র থাকেন। আমার স্বামী ওমান প্রবাসী এবং আমার তিন মেয়ে। আমার চাচা শ্বশুরের সাথে জমি সংক্রান্ত বিষয়ে কোর্টে মামলা রয়েছে। মোলাইম খান আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। আমি মহিলা তাই চাচা শ্বশুরের সাথে জমি সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেই। এরজন্য মাঝেমধ্যে আমার বাড়িতে আসতেন। মামলা পরিচালনার জন্য ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ একই তারিখের কয়েকটি সাদা (লেখাবিহীন) স্ট্যাম্প কাগজে স্বাক্ষর নিতে আসেন মোলাইম। আমি জানতে চাইলে তিনি বলেন মামলা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজে দস্তখত দিতে হবে। আমি সরল বিশ্বাসে সেই সাদা স্ট্যাম্প কাগজে দস্তখত দেই। কিছুদিন পর মোলাইম আমার স্বামীর কাছে মোবাইলের হোয়াটস্অ্যাপে স্বামীকে তালাকের হলফনামার এবং ‘কোর্টম্যারেজের’ কাগজের ছবি পাঠান। আমার স্বামী বিদেশ থেকে ওই হলফনামা কাগজের কথা আমাকে জানান। এ বিষয়টি আমি মোলাইমকে জিজ্ঞেস করি। পরে ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ একই তারিখের দুটি স্ট্যাম্প কাগজে সে প্রতারণার মাধ্যমে আমার দস্তখত নিয়ে (রেজিনং ৭৫৭) কাগজে ‘তালাকনামা’ এবং (রেজিনং ৭৫৮) কাগজে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ হলফনামা দেখিয়ে আমাকে তাঁর স্ত্রী দাবি করে। তখন সে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে আমাকে বিভিন্ন সময় হয়রানী করে ও আমাকে একদিন মারধরও করে। পরবর্তীতে ২০ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে কোর্ট ম্যারেজ এবং তালাকনামা বাতিলের জন্য এফিডেবিটের (রেজি নং-৪৮২৪) মাধ্যমে আদালতে আবেদন করি। এরপরও প্রায় সে আমাকে উত্ত্যক্ত করতে থাকে। ঘটনার দিন মোলাইম আমার শাড়ি জোরপূর্বক খুলে শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করে এবং টেনে হিচড়ে ঘরের বাহিরে নিয়ে এসে আমাকে কাঠের লাটি দিয়ে ব্যাপক মারধর করতে থাকে। এসময় আমার মেয়েরা এগিয়ে এলে তাদের উপর চড়াও হয় মোলাইম। মোলাইম খান এসময় আমার গলায় থাকা এক ভরি ওজনের স্বর্ণালঙ্কার চেইন নিয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি।
এ ব্যাপারে মোলাইম খানের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার দুই স্ত্রী আছে এবং ওই নারীও আমার স্ত্রী। আমি তাকে কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে বিয়ে করেছি। আগের স্বামীর সাথে তাঁর তালাক হয়ে গেছে। ঘটনার দিন তাঁর বাড়িতে গেলে প্রথমে সে আমার ওপরে হামলা চালায়। এক পর্যায়ে আমি আত্মরক্ষার্থে তাকে মারধর করি। তাঁর দাবি, তাঁর সাথে বিয়ের সব কাগজপত্র আপোসের জন্য স্থানীয় ফুলেরতল মসজিদ পঞ্চায়েতের (কমিটির) সাবেক সভাপতি আনারউদ্দিনসহ কমিটির সদস্যদর কাছে দেওয়া আছে।
এ ব্যাপারে কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ ইয়ারদৌস হাসান বলেন, গৃহবধুর উপর এমন অমানবিক নির্যাতন কোনভাবেই কাম্য নয়। গৃহবধু বাদী হয়ে নারী নির্যাতন ও দন্ডবিধি আইনি মামলা করলে মোলাইম খানকে আটক করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

সর্বশেষ সংবাদ