May 20, 2019

বিশ্বশান্তি ও সম্প্রীতির নবদিগন্ত উন্মোচন হোক

রায়হান আহমেদ তপাদার : শান্তির দেশ হিসেবে খ্যাত নিউজিল্যান্ড। গত ১৫ মার্চ ২০১৯ইং নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদ ও লিনউড মসজিদের ভিতরে অস্ট্রেলীয় সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারান্ট নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নামাজ রত অবস্থায় অর্ধশত মুসল্লিদের হত্যা করে। এ ঘটনায় সারা বিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠে বিশ্ব জোড়ে। একেবারে টান্ডা মাথায় সন্ত্রাসী ব্রেন্টন এতোগুলো মানুষকে হত্যা করে ইন্টারনেটে এই গণহত্যার লাইভ ভিডিও সম্প্রচার করছিল। হামলার কারণ সম্পর্কে ট্যারন্ট ৭৪ পৃষ্টার একটি অনলাইন ইশতেহার প্রকাশ করেছিল। এই ইশতেহার থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, সে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ এবং চরম ইসলাম বিদ্ধেষী মনোভাব থেকে এই হামলা করেছে। এই হামলার পরে ব্রিটেনের ৫টি মসজিদে দুর্বৃত্তরা একরাতে হামলা চালায় এবং আমেরিকায় একটি মসজিদেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদ এবং লিনউড মসজিদে ন্যাক্কারজনক ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়াসমূহের নির্লজ্জ ভূমিকা আমরা লক্ষ্য করেছি।ট্যারান্ট নিশ্চয় একা নয়, তবে তার সাথে কারা আছে? কারা তাকে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে? এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর কেউ গরজ বোধ করছে না। মিয়ানমারে মুসলমানদের কচু কাটা করে ও যদি অংসাং সুচির মাথায় শান্তির মুকুট বহাল তবিয়তে থাকে, চীনে ১০ লাখ উইঘুর মুসলমান তাদের ঘর বাড়িতে নেই, ঘরের দরোজায় তালা দেওয়া, অর্থাৎ এরা নিখোঁজ। এদেরকে সরকারী টর্চার শেলে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। তদুপরি তাদের সাহায্যার্থে কেউ এগিয়ে আসছে না।  এখানে ট্যারান্টদের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে কে কথা বলবে? অর্থাৎ মুসলমানদের যত পার, যেভাবে পার মার- নো প্রব্লেম। আমরা এটা ওটা করে করেই সময় পার করব, বড় জোর নিন্দা জানিয়ে একটা বিবৃতি দিয়ে দিব। তবে কোথাও যদি কোন মুসলমান রুখে দাঁড়ানোর দুঃসাহস করে তবে তাকে আচ্ছা মত সায়েস্তা করার জন্য আমাদের যুদ্ধ বিমানগুলো সদাসর্বদা প্রস্তুত আছে। এটাই হচ্ছে আজকের দুনিয়ার বাস্তব অবস্থা। তবে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা অরডার্ন এবং সে দেশের জনগণ মনে হয় স্রোতের বিপরীতে ন্যায়ের পক্ষ্যে দাঁড়িয়েছেন। বাহ্যিক অবস্থা দেখে তাই মনে হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কারণে অকারণে মুসলমানদের উপর চালানো হচ্ছে নিপীড়ন। বিভিন্ন দিক থেকে আওয়াজ আসছে নিস্পাপ শিশু ও অসহায় মা ও বোনের বুকফাটা আর্তচিৎকারের। এক সময় যে জাতি বিশ্বকে শিখিয়েছিল সভ্যতা সংস্কৃতি, পথ দেখিয়েছিল সত্য সুন্দরের আজ সেই জাতির উপরই চলছে মানবতা বিধ্বংসী সকল প্রকার মারণাস্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষা। বলা হয় আজ মানুষ সভ্য হয়েছে, বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে, সভ্যতার বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু আমরা যখন দেখতে পাই ফিলিস্তিন, কাশ্মির, আসাম, চিনের ইউগুর মুসলমান এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের করুন অবস্থা তখন মনে হয় যেন এ পৃথিবীটা এখনো অনাচার ও অবিচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত রয়েছে। সবদিক থেকে যখন শুনা যাচ্ছে মজলুমের আর্তচিৎকার, বিশ্ব মোড়লেরা যখন করছে তাদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ, নিউজিল্যান্ডে যখন মসজিদে নামাজরত অবস্থায় একজন সন্ত্রাসী গুলি করে ৫০ জন মুসল্লিকে হত্যা করেছে তখন সেদেশের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা অরডার্ন এর শান্তির বাণী আমাদেরকে আশান্বিত করেছে।  জাসিন্ডা এবং তার দেশের জনগণ সেদেশের মজলুম মুসলমানদের প্রতি যে সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছেন তা বিশ্বসম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমা মিডিয়া সন্ত্রাসী ট্যারন্টকে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী বলে নাই বরং বলা হয়েছে বন্দুকধারী। সন্ত্রাসী ট্যারন্ট একেবারে ঠান্ডা মাথায় ৫০টি মানুষকে খুন করতে পারলেও বিশ্বমিডিয়া এমনকি পশ্চিমারা তাকে খুনী বলতে চাচ্ছে না। এর আগেও আমরা দেখেছি যারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের অত্যাচার চালিয়েছে তাদেরকে সন্ত্রাসী, জঙ্গী বা টেরোরিস্ট বলা হয়না বরং কোথাও যদি মুসলমানরা নিজেদের অস্থিত্ব রক্ষার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলে তখন সেই মুসলমানদেরকেই বলা হয় সন্ত্রসী, জঙ্গী ইত্যাদি। ২০১১ সালে নরওয়েতে একজন স্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদি এক ঘন্টার মধ্যে ৭৭ জন মুসলমানকে হত্যা করেছিল। তাকেও সেই সময় সন্ত্রাসী না বলে বলা হয়েছিল মানসিক ভারসাম্যহীন। ২০১৮ সালে শুধু আফগানিস্তানে ৯২৭টি শিশু সহ ৩৮০৪জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন বলে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান সরকারের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন বাহিনীর সশস্ত্র তালেবানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে হামলায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে নারী, শিশু সহ অনেক বেসামরিক লোক মারা যাওয়ার পাশাপাশি অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছে সারা জীবনের জন্য। কত ঘর বাড়ি ও সাজানো সংসার ধ্বংস হয়েছে মুহূর্তের ভিতরে। অথচ সব কিছুই হয়েছে সন্দেহের উপর ভিত্তিকরে। কিন্তু ক্রাইস্টচার্চে যা হয়েছে তা মোটেও গোপনে নয়, প্রকাশে দিবালোকে। তাও আবার পূর্ব থেকে ঘোষণা দিয়ে।  তবে সারিবদ্ধ হয়ে যে সব যুদ্ধ বিমান মুহুর্তের ভিতরে উড়ে গিয়ে ইরাক আফগানিস্তানের ঘুমন্ত শিশুদের উপর টন টন বোমা ফেলে আসত এখানে এমন একটি বিমানও উড়ে আসতে দেখা যায়নি। কারণ ট্যারন্ট যা করেছে তা তো খ্রিস্টবাদের পক্ষেই করেছে।জাসিন্ডা অরডার্ণের রাজনীতিতে আসা থেকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত বিজয় ও সফলতা বার বার তার পদচুম্বন করেছে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮০ সালে। মাত্র ২৮ বছর বয়সে ২০১৭ সালে তিনি লেবার পার্টির হয়ে বিশ্বের সর্বকনিষ্ট নারী প্রধানমন্ত্রী এবং নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা অরডার্ন ক্রাইস্টচার্চ ট্র্যাজেডির মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে হামলাকারীকে সন্ত্রাসী জঙ্গি আখ্যায়িত করে তাকে গ্রেফতারের সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি নিহত আহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শোকাহত স্বজনদের নিজের বুকে জড়িয়ে ধরেছেন এবং ঘোষণা দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডে কোনভাবেই মুসলিমরা আতংকিত হবে না। তিনি মুসলিম কমিউনিটির পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং শোকাতুর মুসলিমদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে নিজে কালো জামা এবং মাথায় কালো হিজাব পরিধান করে একাধিকবার ভাষণ দিয়েছেন। ঘটনার পর পরই নিউজিল্যান্ডের সংসদ অধিবেশনে তিনি ইসলামী রীতি অনুসারে আসসালামু আলাইকুম বলে বক্তব্য শুরু করেছেন এবং অধিবেশনের শুরুতে কোরআনের আয়াত তেলাওতের ব্যবস্থা করে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা করেছেন। এভাবে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে বিশ্বশান্তি ও সম্প্রীতির এক নবদিগন্ত উন্মোচন করেছেন।  এছাড়া তিনি শুক্রবারে জুমার আযান ও নামাজ টিভি চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যস্থা করেছেন। সেদিন বিশ্ববাসি দেখেছে আযান শুনার জন্য এবং মুসলমানদের নামাজ দেখার জন্য কিভাবে নিউজিল্যান্ডের হাজার হাজার মানুষ মসজিদের আশেপাশে জড়ো হয়েছিল। নিউজল্যান্ডে ৪২ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ১৩% আদিবাসি। এক সময় মাওরি ধর্ম ছিল এখানকার প্রধান ধর্ম। ১৮ ও ১৯শ শতকে ইউরোপীয়রা বেশিরভাগ মাওরিকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে সক্ষম হয়। এর পর থেকে খ্রিস্ট ধর্মই নিউজিল্যান্ডের প্রধান ধর্ম হিসাবে বিবেচিত হয়। তবে বর্তমানে ধর্মহীনতার দিকে নিউজিল্যান্ডের লোকেরা ঝুকে পড়েছে। সর্বশেষ আদমশুমারিতে দেখা গেছে এক তৃতীয়াংশের ও বেশি অধিবাসী কোন ধর্মে বিশ্বাসী নয়। তবে নিউজিল্যান্ডের মহিলারা সেদিন মুসলিম মহিলাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে হিজাব পরেছিল। এটা তাদের মহানুভবতার পরিচয়। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং সেদেশের জনগণের ভূমিকার দিকে আশা ও আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে এক খন্ড আশার আলো জ্বলে উঠেছে। তবে ঘুরে ফিরে যে প্রশ্নটি দেখা দিচ্ছে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তাহলো যে, সন্ত্রাসী ট্যারান্ট হামলা করার দশ থেকে পনের মিনিট পূর্বে তার হামলা সম্পর্কিত যে অনলাইন ইশতেহার প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে প্রেরণ করেছিল এবং একেবারে নির্বিঘ্নে প্রায় ২২ মিনিটব্যাপী লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ চালালো এই সময়ের মধ্যে কি সন্ত্রাসীকে আটকানো বা তাকে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করা গেলনা নিউজিল্যান্ডের মত একটি উন্নত দেশে? নিউজিল্যান্ডে যেসব উগ্র খ্রিস্টান গ্রুপ রয়েছে এসবের সাথে সন্ত্রাসী ট্যারান্টের সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা তাকে আইনিভাবে সহযোগিতা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, এ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডার কোন মন্তব্য নেই কেন? ১৯৮৯ সালে নিউজিল্যান্ডে মৃত্যুদন্ড আইন বিলুপ্ত করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো সন্ত্রাসী ট্যারন্টের শাস্তি কী হতে পারে? ৫০টি নিরপরাধ তরতাজা প্রাণের খুনীকেও কী সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে না? শুধু তা-ই নয়, এদিন নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী মুসলিম ছাড়াও অন্য ধর্মের অনুসারীদের সংসদে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা নিজ ধর্মের বেশে সংসদে প্রবেশ করেন। পরে প্রথমে মুসলিমদের জন্য সংসদে নামাজের ব্যবস্থা করে দেন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন। এরপর বাকি ধর্মের অনুসারীরাও প্রার্থনা করেন। প্রধানমন্ত্রী উঠে গিয়ে সংসদে আসা মুসলিমদের সঙ্গে গত ১৫ মার্চ মসজিদে হতাহতের ঘটনায় সমবেদনা প্রকাশ করেন। মুসলিম নারীদের বুকে টেনে নেন।এদিকে নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলার পরপরই দেশটির বিদ্যমান অস্ত্র আইন পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে যে কেউ অস্ত্র কিনতে পারে। বয়স ১৬ বছর হলেই এ লাইসেন্স দেওয়া হয়। একবার লাইসেন্স হাতে পেলে একজন ব্যক্তি একাধিক অস্ত্র কিনতে পারে। এ নিয়ে দেশটির গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা আছে। তবে আশার কথা হলো, নিউজিল্যান্ডের মসজিদে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্ত্র আইনে সংশোধন আনা হচ্ছে। ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পরই এ আইন সংস্কারের কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন। সব কিছু মিলিয়ে হামলা-পরবর্তী নিউজিল্যান্ডের সরকার, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা গোটা বিশ্বের কাছে প্রশংসনীয় হয়েছে।

লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ