April 23, 2019

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে হতাশা দূর করা জরুরি

রায়হান আহমেদ তপাদার : মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ৷ কিন্তু এই মানবিকতার কারণেই এখন নানা ঝুঁকিতে পড়েছে দেশটি৷ খুব সহসাই এ সংকটের সমাধান হবে না৷ ফলে সারাদেশে রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, আছে নানা চ্যালেঞ্জও৷ রোহিঙ্গাদের মধ্যে আছে এইডস আক্রান্ত মানুষ৷ বাংলাদেশে এখন কলেরা না থাকলেও রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে সেই সমস্যাও৷ বন উজার হচ্ছে, পাহাড় কেটে ধ্বংস করছে তারা৷ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও আছে এর সঙ্গে৷ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাও প্রকট হতে পারে, বাড়তে পারে নিরাপত্তা ঝুঁকিও৷ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এই সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবেলা করবে সেটা ঠিক করাই এখন একটা চ্যালেঞ্জ৷ বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরকারকে এবার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে৷ না হলে দেশকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হতে পারে৷উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অদূরে অবসি’ত নৌকার মাঠের আধিপত্য বিসত্মারকে কেন্দ্র করে দুই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রম্নপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্প ইনচার্জসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস’লে পৌঁছালে রোহিঙ্গারা তাঁদের উপর ইটপাটকেল নিড়্গেপ করে। আত্মরড়্গার্থে পুলিশ ৭/৮ রাউন্ড রাবার বুলেট ছুড়লে রোহিঙ্গারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংঘর্ষ, খুনোখুনি নতুন কোন বিষয় নয়। তাঁরা এদেশে আশ্রয় নেয়ার পর থেকেই নানান রকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। তাঁরা নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি এবং স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে রোহিঙ্গা সহ স্থানীয় মানুষও খুন হয়েছে তাঁদের হাতে।  উল্লেখ্য তাঁরা আমাদের দেশের আইন কানুন মানতে চায়না, তোয়াক্কা করতে চায় না বলেও পুলিশের অভিযোগ। তাঁরা এদেশে সুখে শান্তিতে বসবাস করলেও নিজেরাই সব সময় নিজেদের মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ছিনতাই, ডাকাতি, গুম, অপহরণ সহ নানা অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে বলেও জানা যায়।তাদের স্থানীয় অধিবাসীদের কারণে স্থানীয় অধিবাসীরা নানা সঙ্কটের মধ্যে দিন যাপন করছে। কাজের অভাব হচ্ছে, নিত্যব্যবহার্য পণ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে। সুপেয় এবং ব্যবহার্য পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। স্থানীয় নিম্নবিত্তদের জ্বালানি কাঠের অভাব দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। রোহিঙ্গারা বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করার ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনছে। মোটা দাগে বলতে গেলে স্থানীয় অধিবাসীরা বিরাট সংখ্যক রোহিঙ্গাদের চাপের কাছে যেন সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দাতা ও সেবা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন ধরণের, অনেকড়্গেত্রে একাধিক দাতা সংস্থা প্রয়োজনের তুলনায় একই ধরণের অতিরিক্ত ত্রাণ সামগ্রী দিচ্ছে।ফলে বিভিন্ন কেনাকাটার জন্য তাঁদের নগদ টাকার প্রয়োজনে তারা ত্রাণসামগ্রী বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কেউই তাঁদের রান্নার জন্য জ্বালানির ব্যবস্থা করছে না। প্রতি মাসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ৬ হাজার ৮০০ টন জ্বালানি কাঠের প্রয়োজন হয় বলে জানা যায়। এরা এসব জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ বাংলাদেশের বনাঞ্চল ধ্বংস করে। কক্সবাজার শিবিরে বাসস্থানচ্যুত রোহিঙ্গারা গাদাগাদি করে আছে। ফলে সেখান থেকে ভাসানচরে তাঁদেরকে স্থানান্তরে আপত্তি জানিয়ে আসছিলো জাতিসংঘ। এদিকে তাঁরা আবার জানিয়েছে যে, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে তাদের আপত্তি নেই তবে তাদের জোর করে পাঠানো যাবে না।  রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় যেতে চাইলে যাবে অন্যথায় নয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এ কে এম মোজাম্মেল হক গত ১৩ মার্চ’১৯ আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক এক বৈঠকের পর জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কোথায় হবে সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়। বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে তাঁদেরকে আশ্রয়, নিরাপত্তা ও খাদ্য দেয়া, মানবিক আচরণ, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত করা। এখানে জাতিসংঘের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তাঁদের দেখার বিষয় মানবিক দিকগুলোর কোন ঘাটতি আছে কিনা। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, এ পর্যনত্ম দাতা সংস্থাগুলোর কর্তাদের হোটেল বিল বাবদ হয়েছে দেড়শ কোটি টাকা সে হিসেবে রোহিঙ্গাদের পেছনে ২৫ শতাংশও খরচ করা হয়না বরং কর্মকর্তাদের তদারকিতেই ৭৫ ভাগের বেশি অর্থ তাঁরা ব্যয় করছে যা খুব দুঃখজনক। এখানে অনেক এনজিও কাজ করছে তবে তাঁদের কিছু সংখ্যক এনজিও অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে যা আমাদের গোয়েন্দা রিপোর্টেও উঠে এসেছে বলে মন্ত্রী জানান। ভাসানচরের আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গাদের রাখার জন্য সকল প্রসত্মুতি প্রায় সমাপ্ত করা হয়েছে বলে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন আগামী ১৫ এপ্রিলের আগে পড়ে যে কোন সময়ে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের কাজ শুরম্ন হতে পারে। রোহিঙ্গাদের অতি দ্রম্নত ভাসানচরে স্থানান্তরের ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা রয়েছে বলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী সাংবাদিকদের অবহিত করেন।এ পর্যন্ত ৮ লাখ ৭২ হাজার ৮৮০ জন রোহিঙ্গা বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ২ লাখ ১২ হাজার ৬০৭ টি গোসলখানা,ত্রাণ সংরক্ষণের জন্য ২০ টি অস্থায়ী গুদাম, ১৩ কিলোমিটার বিদ্যুতের লাইন, ৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ এবং ২০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে।  বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক একটি অবকাঠামো তৈরি করবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বনভূমি ও বনজ সম্পদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে গেলেও জায়গা জবরদখল হয়ে যেতে পারে এবং স্থাপনাগুলো অপসারণ করে বনায়ন করা কঠিন হবে এমতাবস্তায়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে, মানবিকতা, সহানুভূতি, মহানুভবতা, উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টানত্ম সৃষ্টি করার পাশাপাশি সমসাময়িক সময়ে একমাত্র বাংলাদেশই বিরাট সংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় দিয়ে সারা বিশ্বে মর্যাদা, সুনাম, খ্যাতি অর্জন করলেও বাংলাদেশ এখন নিজেই মানবিক, সামাজিক, নৈতিক, আর্থ সামাজিক, প্রাকৃতিক, পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ, ভয়ংকর সঙ্কটের মুখোমুখি। বাংলাদেশের উন্নয়নের অব্যাহত অগ্রযাত্রা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপে পিষ্ট, ভুলুণ্ঠিত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা করছেন রাষ্ট্র ও সমাজ বিজ্ঞানীসহ অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা দেশ ও জাতির গভীর প্রত্যাশা জাতিসংঘ বাস’চ্যুত রোহিঙ্গাদের তাঁদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে বিশ্বনেতৃবৃন্দকে নিয়ে যথাশীঘ্র সম্ভব বাস্তব সম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অন্যথায় বাংলাদেশের সব অর্জন ধীরে ধীরে মস্নান হয়ে যেতে পারে। মায়ানমারে ফেরত যাওয়া বাসস্থানচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকার। মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার কোন শাসকগোষ্ঠী কেড়ে নিতে পারে না। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে মায়ানমারে মানবতার মৃত্যু ঘটেছে। মানুষ তাদের জন্মগত অধিকার হারিয়েছে। কোন সুস্থ মানুষ এমন মানবিক, নৈতিক বিপর্যয় আশা করে না। যত দিন যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বিলম্বি হচ্ছে।  জাতিসংঘ নানা কথা বললেও মিয়ানমারকে বাধ্য করার ব্যাপারে কোন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। আনত্মর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অত্যাচারী সেনা সদস্যদের অভিযুক্ত করে শাসিত্ম দিতে না পারলে মিয়ানমারকে কাবু করা যাবে না। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পুনর্বাসনে যথাসাধ্য করছে। ভাসানচরে প্রত্যাবাসন তারই একটি অংশ মাত্র। এই প্রচেষ্টায় আমরা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীসমূহের সমর্থন কামনা করি।পশ্চিমা দেশগুলো রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে এবং মানবিক সহায়তাও দিচ্ছে। কিন্তু তাদের সঙ্গেও কিছুটা মতপার্থক্য আছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যতের বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলো চায় বাংলাদেশে তাদের ওপর বিনিয়োগ করতে যাতে মানবসম্পদের উন্নতি করা যায়। কিন্তু সরকার চায় এই বিনিয়োগ রাখাইনে করার জন্য, যাতে করে তারা ফেরত গিয়ে সেখানে সুন্দর জীবনযাপন করতে পারে।একজন কর্মকর্তা বলেন,আমরা সবাই চাই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ এবং সম্মানজনক প্রত্যাবাসন। কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে তাদের ওপর আমাদের মতপার্থক্য আছে এবং আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে একটি কমপ্রোমাইজে পৌঁছানো যায়। তিনি বলেন,যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবর্তোভাবে সহায়তা করছে এবং আমরা চাই তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করুক।এদিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের (রিলোকেট) বিষয় নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়ার অপপ্রচারণা নিয়ে বিরক্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুসারে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলার৷ সেই হিসাবে এই ৭ লাখ রোহিঙ্গার মাথাপিছু আয় হওয়ার কথা ১১২ কোটি ডলার বা ৮ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা৷  কিন্তু আশ্রিত হিসেবে রোহিঙ্গাদের আয়ের কোনো উৎস নেই৷ জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ব্যয় প্রায় ৭০০ ডলার৷ কিন্তু রোহিঙ্গাদের ব্যয় থাকলেও বৈধপথে আয়ের কোনো উৎস নেই৷ সেই হিসাবে এই ৭ লাখ রোহিঙ্গার  পেছনে সরকারের বছরে ব্যয় হবে প্রায় ৪৯ কোটি ডলার বা ৩ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা, যা অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা৷ বর্তমানে কিছু সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি এই সাহায্য অব্যহত থাকবে সেটা বলা মুশকিল৷ যখন পাওয়া যাবে না তখন বাংলাদেশকেই এই টাকা খরচ করতে হবে৷ রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশ বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞমহল।কারণ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পেছনে বাড়তি মনোযোগ দিতে হয়৷ সেজন্য সেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন নিয়োগ করতে হয়েছে৷ এর ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ছে৷ আর এই ব্যয়টা খরচ হচ্ছে বাজেট থেকে৷ অথচ রোহিঙ্গা সমস্যা না থাকলে এই টাকা অন্য জায়গায় ব্যয় করা যেত৷ সেটা করা গেলে দেশের কিছু মানুষ তো অন্তত ভালো থাকত!। লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ