April 23, 2019

ভেজালমুক্ত এবং নিরাপদ খাদ্য মানুষের অধিকার

রায়হান আহমেদ তপাদার : মানুষের জীবনের জন্য পানি এবং খাদ্য অপরিহার্য। কিন্তু সব পানি যেমন পানের যোগ্য নয়, তেমনি সব খাবার স্বাস্থ্যের জন্য সুখকর নয়। এক কথায় বলা যায় একমাত্র বিশুদ্ধ পানিই কেবল পানের যোগ্য। ঠিক তেমনি সব খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়। শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ খাদ্যই জীবনকে বাঁচাতে, রোগমুক্ত রাখতে সক্ষম। তবুও বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। তবে তা নিশ্চয় পুষ্টিকর, সুষম, ভেজালমুক্ত এবং নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন। এধরনের খাবার ও পানিও একজন মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিনের খাদ্যই যদি বিষাক্ত হয়,পানি দূষিত,পানের অযোগ্য হয় তাহলে ফলাফল কি দাঁড়ায়? জীবনকে বাঁচাতে সহায়তার পরিবর্তে জীবনকে প্রতিমুহূর্তে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। অথচ আমাদের বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত। এটি সত্য আমরা এখন চাল সহ সব রকমের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেই খাদ্য কতটুকু নিরাপদ, মানসম্মত, স্বাস্থ্যসম্মত এটা প্রশ্নাতীত নয়। বরং হলফ করে বলা যায়, আমরা প্রতিদিন যা খাচ্ছি তার নব্বই ভাগই অস্বাস্থ্যকর,অনিরাপদ। কিন্তু ভেজাল, অনিরাপদ খাদ্য, পানির পরিবর্তে বিশুদ্ধ পানি,স্বাস্থ্যসম্মত ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু তাতেও এর কোন সুরাহা হচ্ছে না।তাই এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলের কড়া দৃষ্টি সবার কামনা। উল্লেখ্য কলেজ, বারডেম, পিজি, কলেরা, পঙ্গু হসপিটাল সহ সকল হাসপাতালে নেই রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত আসন ব্যাবস্থা, গরীব রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে সুচিকিৎসা থেকে, তাদের কাছ থেকে বেশি অর্থ আদায়েরও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে প্রায়শই। এমনকি ছোটখাট ডাক্তাররাও এমনকি কিছু ফার্মেসীতে ভুয়া ডাক্তার বসে এক্সরে দেওয়ার নামে পারসেন্টিজ খাচ্ছে ডায়গনস্টিক সেন্টার থেকে। এরকম ফার্মেসী ঢাকা শহর সহ গ্রামের বিভিন্ন অলিগলিতেও পাওয়া যাবে। মোবাইল কোর্ট, রেব, পুলিশ এদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিচ্ছেনা।সরকারী হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার সংকট, উপযুক্ত যন্ত্রপাতির অভাব,জায়গার সংকট সহ বহু সংকট রয়েছে যেগুলো গত ২০ বছরে কোন সরকারই ঠিক করতে পারেনি।এপোলো,স্কয়ার,ল্যাবএইড সহ ঢাকা শহরের অনেক হাসপাতালে চিকিৎসার যা খরচ তাতে উচ্চবিত্তদের কোন সমস্যা না হলেও নিন্মবিত্ত, মধ্যবিত্তদের পক্ষে সেখানে চিকিৎসা নেয়াটা অনেকটাই অসম্ভব ব্যাপার। উপজেলা হাসপাতাল গুলোর অবস্থা এতই করুন যে রোগীর চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠালে পথিমধ্যেই রোগীর মৃত্যু হয় প্রায়ই।অথচ সেখানে যদি পর্যাপ্ত ডাক্তার থাকত,যন্ত্রপাতি থাকত, ব্যবস্থা থাকত তাহলে প্রতি বছর বহু রোগীকে বাচান যেত।হাইওয়েগুলোতে ক্লিনিক করলে অনেক রোগীদের চিকিৎসা দেয়া যেত দুর্ঘটনাজনিত সময়ে এবং সেক্ষেত্রেও মৃত্যুর হার কমে আসতে কিন্তু সেটাতো বাস্তবে অসম্ভব।স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য আমেরিকা-ইউরোপ- এর মত মেডিকেল ইন্সুরেন্স করতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের মত দেশে সেটা সম্ভব নয়।যাই হোক সমগ্র বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সমস্যার মত গুরুত্বপুর্ন বিষয়ে সমাধানের লক্ষ্যে সরকারেরর আশু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। যদিও বাংলাদেশে গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও রাজধানী পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবাদানের জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাদান কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে ও বহু দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কিন্তু এখনও দেশের ৪৩.১% মানুষকে কেন ফার্মেসী ও ডিগ্রিবিহীন ডাক্তারের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধের ব্যবস্থাপত্র নিতে হচ্ছে ।  সরকার চিকিৎসাসেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে । ২০১৪ সালে একযোগে ছয় হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে পাঠানো হয়েছিল গ্রামে। তাঁদের ৭৫ শতাংশ এরই মধ্যে গ্রাম ছেড়েছেন। বাকিরাও গ্রাম ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চিকিৎসকদের গ্রাম ছাড়ার নানা অজুহাত থাকে। অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। আবার ঢাকায় অনেক বিশেষায়িত হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের চিকিৎসক না থাকলেও প্রেষণে নিযুক্ত অনেক চিকিৎসক আছেন, যাঁদের কোনো কাজ নেই। অনেকেই নিয়মিত হাসপাতালে হাজিরা দেন না। প্রেষণে কোনো না কোনো হাসপাতালে বদলি হয়ে এসে কাজ করেন বাইরের কোনো ক্লিনিক বা বেসরকারি হাসপাতালে। অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা শোচনীয়। সেখানে ভবন আছে, বরাদ্দ আছে, চিকিৎসা সরঞ্জামও আছে; কিন্তু চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা যারা দেবেন, সেই চিকিৎসকরা সেখানে থাকেন না। আমরা কি কখনো জানতে পেরেছি যে ভেজাল নামের অদ্ভুত এক আচরণ আমাদের জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছে। তীব্র শীতের রাতের গর্জন। মাঝ নদীতে সাঁতার কেটে চলছে একটি মানুষ-পক্ষাঘাতে যার একটি হাত অবশ। আবার অন্যদিকে মাথার উপর দিয়ে ভীষণ ঝড় তুফান বয়ে চলেছে। বর্তমান বাস্তবতায় নাটকীয়তার মত জীবনের পথ পরিক্রমায় এই হল আমাদের নীরব যাত্রার একটি অলিখিত বিমর্ষ কাহিনী মাত্র। গত দুই দশকে বাংলাদেশ ভেজালের স্বর্গ রাজ্যে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরগুলিতে আমাদের দেশে খাদ্য সামগ্রীতে ভেজালের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এফ এ ও এর তথ্যসূত্রে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষ ভেজালের বিষক্রিয়ায় নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৯৮০ সালে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ লক্ষ লোক, বর্তমানে এ সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি অথবা এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তাদের এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, দেশে প্রতিদিন পাঁচ শতের অধিক মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। যার পিছনে একমাত্র কারণ হল খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ। প্রতিদিনই মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়া বিপদজনক পরিস্থিতির দিকে মোড় নিচ্ছে। অজানা অচেনা অদৃশ্য রহস্যময় যে কোন আচরণ সর্বদা আমাদের ভয় পাওয়ার মত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাছ থেকে বাজারে আসা পর্যন্ত প্রতিদিন ফলের মধ্যে পঁ পাঁচ-ছয় বার করে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ স্প্রে করা হয়ে থাকে। সবজি বাগানে কীটনাশক হিসাবে বিষাক্ত রাসায়নিক মাত্রাতিরিক্ত স্প্রে করা হয়। যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। এরারুট, ভাতের মাড় আর খাওয়ার অনুপযুক্ত পানি ব্যবহার করে মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদান গাভীর দুধ তৈরী করা হয়। ফল পাঁকাতে ক্ষতিকর মাত্রাতিরিক্ত কার্বাইড ব্যবহার করা হয়। যা স্বাস্থ্যের জন্য অতিশয় ক্ষতিকর। মুড়ির রং ধবধবে সাদা করতে এ যুগের অসাধু ব্যবসায়ীরা এখন ইউরিয়া সার ব্যবহার করে থাকে। জিলাপি মচমচে করার জন্য অসাধু ব্যবসায়ী পোড়া মবিল ব্যবহার করে থাকে। মানুষের স্বাস্থ্য ঝুকির অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি। ভেজালের সাম্রাজ্যের সর্বশেষ যোগ হয়েছে প্লাষ্টিকের চাউল ও ডিম।  এছাড়া রঙিন খাবার তৈরীতে ব্যবহৃত হয় ক্ষতিকর কাপড়ের রং, যা মানবদেহে ক্যান্সারের অন্যতম কারণ বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সকল টাট্কা ফলমূল, মাছ-মাংস, দুধ ইত্যাদি বহুদিন পর্যন্ত সতেজ রাখার মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে বহুল আলোচিত ফরমালিন দেদারসে প্রয়োগ করা হয়। এই ভাবে নির্বিচারে ফরমালিন ব্যবহারের ফলে মানুষের ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপন একটি কঠিন ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারনায় দৃশ্যমান ক্ষতির মধ্যে মানুষের মূল্যবান অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমন লিভার সমস্যা, লিভার সিরোসিস, কিডনী অকেজো, হার্টের অসুখ, অ্যাজমা, এল্যার্জিক সমস্যা এগুলি এক সময় জীবন বিধ্বংসী মহামারী আকারে রূপ নিতে পারে যা এই অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ হুমকি রূপে আমাদের সামনে দৃশ্যমান হবে। ভেজাল খাবার গ্রহণের ফলে পরিপাকতন্ত্রে জটিলতা, হজমে সমস্যা, ডায়রিয়া, পানি শূন্যতা, অরুচি, বমি-বমি ভাব, মাথাব্যথা সহ নানা জটিলতা এক সময় আমাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থাকে হুমকীর মুখে ফেলে দিতে পারে। খাদ্যে ভেজালকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কঠিন শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। কেননা ভেজাল প্রক্রিয়াকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লক্ষ কোটি মানুষকে নিরবে অকাল মুত্যর দিকে নিয়ে চলছে।অতএব এ ধরণের হীন অপকর্মকারীর বিরুদ্ধে কি পরিমাণ কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন-এখন সময় এসেছে তার একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং পরোক্ষ গণহত্যাকারী হিসাবে এদের চিহ্নত করে বিচারের মুখোমুখি এনে দাঁড় করানো একটি জরুরী কাজ বলে আমর ধারণা।কতিপয় অসাধু নিকৃষ্ট ব্যবসায়ী কর্তৃক জাতির প্রতি এযাবৎ সংঘঠিত এই সমস্ত ঘৃণ্য নিষ্ঠুর তামাশার নির্যাতন আমাদের অসহায়ত্বের চরম আত্মপ্রকাশ-যা নিবারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ববোধ একটি বড় বিষয়।  সম্প্রতি স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর এক গবেষণায় দেখা যায় যে, বিভিন্ন রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ ও সেবা নেবার জন্য বাংলাদেশের মানুষদের শতকরা ২৩.৪ ভাগ ওষুধের দোকান বা ফার্মেসিতে যায়, শতকরা ১৯.৭ ভাগ মানুষ পরামর্শ ও ওষুধের জন্য গ্রাম্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, শতকরা ১৬.২ ভাগ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এমবিবিএস বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেন, শতকরা ৯.০ ভাগ মানুষ প্রাইভেট ক্লিনিকে যায়। অপরপক্ষে শতকরা ১২.১ ভাগ মানুষ উপজেলা হাসপাতাল, শতকরা ৯.০ ভাগ মানুষ জেলা হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যায় এবং শতকরা ৪.১ ভাগ মানুষ সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় যে, শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে যায় এবং মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ শারীরিক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে এমবিবিএস ডাক্তারের কাছে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন,ভেজাল,পচাঁবাসি খাওয়ার এবং দূষিত পানি পান করে শিশু, নারী, বয়োবৃদ্ধসহ সকল শ্রেণির মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ক্যান্সারসহ নানা মৃতুঘাতী রোগে। এই অবস্থা থেকে মানুষকে পরিত্রাণে এখনই প্রয়োজন সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্ঠা। নিরাপদ খাদ্য,পানীয় নিশ্চিত করা না গেলে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর আমাদের খাদ্য ভাবত যে অর্থ খরচ হবে তার চেয়ে ওষুধপথ্যে অর্থব্যয় বাড়বে অনেক বেশি। সুতরাং আমাদের নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থাকে যে কোন মূল্যে একটি নিখুঁত অগ্রযাত্রার সম্মুখে এনে দাঁড় করতে আমাদের যা করার প্রয়োজন তা অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ