October 18, 2019

শান্তির দেশে অশান্তির বার্তা

রায়হান আহমেদ তপাদার : শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডের এই মর্মান্তিক ঘটনা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই হামলা করেছে ঘৃণাবাদি ভাবাদর্শধারীরা। এই হামলার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখন পর্যন্ত যা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে তা হচ্ছে টারেন্টের নিজের টুইটারের বক্তব্যই। তার মতে, নিউজিল্যান্ড হামলার জন্য তার আসলে পছন্দ ছিল না; কিন্তু এই হামলার মধ্য দিয়ে সবাইকে এই মর্মে সচেতন করা যে, আমাদের সভ্যতা হুমকির মুখে, কোথাও আমরা নিরাপদ নই এবং আক্রমণ কারীরা সুযোগ পেলেই আমাদের সভ্যতার ওপর আঘাত হানতে চেষ্টা করছে। সে নিজেকে লাখ লাখ ইউরোপিয়ান এবং শ্বেতাঙ্গ জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি দাবি করে বলে, আমাদের অবশ্যই নিজেদের অস্তিত্ব এবং শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে। এই ঘটনার সঙ্গে অনেকটা গত ২০১১ সালে নরওয়েতে একজন বন্দুকধারীর গুলির সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। সে সময় ব্রেইভিক নামক প্রায় একই বয়সী এক ব্যক্তি দুই স্থানে গিয়ে এ হামলা চালায় এবং তার এলোপাতাড়ি গুলিতে প্রাণ হারায় প্রায় ২শ’ মানুষ। আবার নতুন করে ক্রাইস্টচার্চে যে হামলাটি সংঘটিত হয়ে গেল, তা নিউজিল্যান্ডের জাতীয় গৌরবের জন্য যতটুকু না কলঙ্কজনক, তার চেয়ে বেশি ভোগাবে দেশটির ক্রিকেটকে। যে কারণে পাকিস্তান কার্যত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভেন্যু হিসেবে নিষিদ্ধ হয়ে রয়েছে গত ১০ বছর ধরে। সেই একই কারণে নিউজিল্যান্ডেও যদি ভবিষ্যতে নিরাপত্তার শঙ্কায় অপর কোনো দল যেতে সম্মত না হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অতি সম্প্রতি ক্রাইস্টচার্চে ব্রেন্টন টারান্ট যে ৪৯ জন নিরীহ মুসলমান নাগরিককে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করল, তাকে নিছক একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড ভাবলে আমরা ভুল করব।  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তাদের সিরিজের তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ খেলার জন্য বর্তমানে ক্রাইস্টচার্চে অবস্থান করছে। ১৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়ার কথা টেস্টটি এবং দলের সদস্যরা সে সময় মসজিদে জুমার নামাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। দলের অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ সংবাদ সম্মেলন করছিলেন এবং সেটা শেষ হতে একটু দেরি হওয়ায় তাদের মসজিদে পৌঁছতে কিছুটা দেরি হওয়ার কারণে বলা চলে, পরম ভাগ্যগুণে তারা এই ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে গেছেন। আর মাত্র কয়েক মিনিট আগেও যদি তারা মসজিদে গিয়ে পৌঁছতেন, তাহলে হয়তো বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য শোকাবহ কোনো ঘটনা ঘটে যেতে পারত। তা সত্ত্বেও আমাদের ক্রিকেটাররা সেখানে পৌঁছামাত্রই দেখতে পান রক্তাক্ত অবস্থায় অনেককে পড়ে থাকতে এবং অনেককে রক্তমাখা অবস্থায় বেরিয়ে আসতে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমাদের ক্রিকেট দলের সদস্যরা প্রথমে বাসে উঠে শুয়ে পড়েন। অতঃপর আতঙ্কে হ্যাগলে পার্ক দৌড়ে অতিক্রম করে স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে রক্ষা পান। এখানে বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কোনো নিরাপত্তা সদস্য তো দূরের কথা, নিউজিল্যান্ড বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো লিয়াজোঁ কর্মকর্তা পর্যন্ত সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এ অবস্থায় সিরিজের সর্বশেষ টেস্ট বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ দলের সদস্যরা খুব সহসা দেশে ফিরে আসবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান বলেছেন, ভবিষ্যতে স্ট্যান্ডার্ড নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে দেশের ক্রিকেট টিমকে আর বিদেশ সফরে পাঠানো হবে না বলেও জানিয়েছেন। এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী ঘৃণা প্রচারণার অংশবিশেষ। এর মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বিশ্বব্যাপী শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা, ধর্মীয়ভাবে মুসলমানদের ঘৃণা করা এবং ধর্মীয় বিভক্তি সৃষ্টি করে ‘সুবিধা’ আদায় করে নেওয়া। ক্রাইস্টচার্চের হত্যাকাণ্ডকে আমরা এখন কিভাবে মূল্যায়ন করব? প্রথমত, নিঃসন্দেহে এর একটি ধর্মীয় দিক আছে। হত্যাকারী ব্রেন্টন টারান্ট একজন উগ্র দক্ষিণপন্থী বর্ণবাদী মানুষ। এটা বর্ণবাদী আচরণের নতুন এক রূপ। বিশ্বব্যাপী নতুন করে এক ধরনের বর্ণবাদী আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। মার্কিন মুল্লুক থেকে আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপের দেশগুলোতেও বর্ণবাদী আচরণ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জন্ম হচ্ছে উগ্র দক্ষিণপন্থী সংগঠনের, যারা এক ধরনের ঘৃণার রাজনীতির জন্ম দিয়ে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। তিনি প্রচণ্ডভাবে মুসলমান বিদ্বেষী। তিনি চান বিশ্বব্যাপী শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। ট্রাম্প তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস এ কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। এর আগে পৃথিবীর যেসব জায়গায় মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে এবং মুসলমানদের হত্যা করা হয়েছে, তিনি সেসব ঘটনা থেকে উৎসাহিত হয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, তিনি একাই ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন। কিন্তু ‘পরিকল্পনা’ প্রণয়ন করা, বাস্তবায়ন করা এর সঙ্গে আরো লোকজন জড়িত রয়েছে এবং এটা একটা সুদূর পরিকল্পনার অংশ। হত্যাকারী ব্রেন্টন টারান্ট লাইভ সম্প্রচার করে দীর্ঘ ১৭ মিনিট ধরে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করলেন, আগ্নেয়াস্ত্র বদল করে হত্যাকাণ্ড চালানোর বিষয়টি কারো নজরে পড়ল না কেন?  সংবাদ মাধ্যমের তথ্যানুযায়ী তিনি টুইটারে তাঁর তথাকথিত ইশতেহারটি প্রকাশ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্নের কার্যালয়ে তার একটি কপিও তিনি পাঠিয়েছিলেন। সংবাদপত্র আমাদের সে খবরই দিয়েছে। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সতর্ক হলো না কেন? এটা কি প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতা? গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা, নাকি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে? নিউজিল্যান্ডকে বরাবরই একটি ‘শান্তির দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ৯/১১-এর ঘটনাবলির পর বিশ্বের অনেক দেশেই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেও নিউজিল্যান্ড ছিল ব্যতিক্রম। কিন্তু এই শান্তির দেশ’টিও এখন অশান্ত হয়ে উঠল। এই হেইট ক্রাইম এখন শ্বেতাঙ্গ শাসিত দেশগুলোতে, বিশেষ করে ইউরোপে ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্রেন্টন টারান্ট তাঁর তথাকথিত ইশতেহারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একজন ব্যবসায়ী ও উগ্র মানসিকতাসম্পন্ন লোক ট্রাম্প নির্বাচনের আগে ২০১৬ সালে ধরনের শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ আর ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে সাধারণ আমেরিকানদের মন জয় করতে পেরেছিলেন। মার্কিন সমাজ মূলত অভিবাসীদের নিয়েই গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনীতিতে বিশ্বের এক নম্বরে পরিণত হয়েছে, এর পেছনে রয়েছে অভিবাসীদের বড় অবদান। এটা ঠিক, এই অভিবাসীদের একটা বড় অংশ শ্বেতাঙ্গ; কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ, চৈনিক কিংবা এশিয়ান অভিবাসীদের অবদানকে ছোট করে দেখা যাবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি তাঁর হেইট ক্যাম্পেইন অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর এক নম্বর টার্গেট হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অভিবাসী। বিশেষ করে মুসলমান অভিবাসীদের বের করে দেওয়া এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। নিঃসন্দেহে ট্রাম্পের এই স্ট্র্যাটেজি ব্রেন্টন টারান্টের মতো হত্যাকারীদের অনুপ্রেরণা জুুগিয়ে থাকবে। হত্যাকারী ব্রেন্টন কালো সূর্য নামে একটি নব্য নাজি সংগঠনের সদস্য। এই নব্য নাজিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংগঠিত হচ্ছে! এরা নাজি মতাদর্শকে গ্রহণ করছে, নাজিবাদকে আদর্শ হিসেবে মানছে। এমনকি তাদের সিম্বলও গ্রহণ করছে। এই নাজিবাদী সংগঠনগুলো এখন সভ্যতার প্রতি এক ধরনের হুমকি ১৯৯২ সালে জন্ম নেওয়া কমব্যাট ১৮ নামে একটি সংগঠনের কথা আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি। ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া উগ্র কট্টরপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী এই সংগঠনের শাখা এখন ইউরোপের ১৮টি দেশে সংগঠিত হয়েছে। এদের মূল আদর্শ হচ্ছে শ্বেতাঙ্গ কর্তৃত্ববাদ, ইসলামবিরোধী ও শক্তিশালী একক নেতৃত্ব। এদের রাজনীতির সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে অভিবাসী প্রসঙ্গটি। ২০১৫-১৬ সালে ইউরোপে ব্যাপকভাবে সিরীয় অভিবাসী আসায় পুরো ইউরোপের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে বদলে দেয়। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল প্রায় ১০ লাখ সিরীয় অভিবাসীকে জার্মানিতে আশ্রয় দিয়ে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হলেও, তিনি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি গ্রহণ করেছিলেন। মুসলমান এই অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে ইউরোপে আগমনকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থী ডানপন্থী দলগুলো সেখানে শক্তিশালী হয়। শুধু তা-ই নয়, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিতে তারা এখন ক্ষমতার কাছাকাছি। ২০১৭ সালের নির্বাচনে জার্মানিতে উগ্র নব্য নাজি সংগঠন অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি তৃতীয় স্থান পেয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। এটা ছিল একটা অকল্পনীয় ব্যাপার।  একসময় একেবারেই অপরিচিত এই দল এখন ক্ষমতার কাছাকাছি। তারা যদি পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতার স্বাদ পায়, তাহলে ইউরোপে নতুন এক যুদ্ধের সূচনা হতে পারে। শুধু জার্মানির কথা কেন বলি? ফ্রান্সে ন্যাশনাল ফ্রন্টের উত্থান, ইতালিতে নর্দান লীগের ক্ষমতার অংশীদার, হাঙ্গেরিতে ‘জব্বিক’ কিংবা ‘নরডিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট’ পুরো নরডিকভুক্ত দেশগুলোতে যেমন-সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক যেভাবে নব্য নাজি সংগঠন গুলোর কর্মকাণ্ড বিস্তার লাভ করছে, তা যেকোনো শুভবুদ্ধির মানুষের জন্য চিন্তার কারণ। এরা ইউরোপে হেইট ক্রাইম এর জন্ম দিয়েছে এবং লোন উলফ বা একক সন্ত্রাসী হামলার জন্ম দিয়ে তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। উগ্র এই সংগঠনগুলো ইউরোপের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। মুসলমান অভিবাসীদের কারণেই ব্রেক্সিটের জন্ম। আগামী দিনে এসব নব্য নাজিবাদী সংগঠনের জন্য ইউরোপ এক বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে এবং পরিস্থিতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের হত্যাকাণ্ডে বিশ্বনেতাদের শোক ও নিন্দা প্রকাশ পেলেও ঘটনাটি বেশ কিছু বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে, যা আগামী দিনের বিশ্বরাজনীতি কে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করবে।

লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ