September 15, 2019

শান্তি ও নিরাপত্তা হুমকিতে দক্ষিণ এশিয়া

রায়হান আহমেদ তপাদার : ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের ইতিহাস অনেক পুরনো। এই দ্বন্দ্বের কারণে তিন-তিনবার দেশ দুটি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এর মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে দুই-দুইবার১৯৪৭-৪৮ সালে একবার, আর ১৯৬৫ সালে দ্বিতীয়বার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশ দুটি তৃতীয়বারের মতো যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছিল। এর বাইরে কারগিলকে কেন্দ্র করে আরো একবার যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, যা কিনা জেনারেল মোশাররফকে ক্ষমতা দখল করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পাকিস্তান-ভারত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা আর অস্ত্র প্রতিযোগিতা এ অঞ্চলের উন্নয়নের পথে অন্যতম অন্তরায়। ভারত ও পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তির অধিকারী। ভারত পর পর দুইবার পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অন্যতম পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ওই ঘটনা পাকিস্তানকে পারমাণবিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সিপরির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী পাকিস্তানের কাছে বর্তমানে ১৩৫টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে আর ভারতের রয়েছে ১২৫টি। ২০১৭ সালে উভয় দেশ ১০টি করে ওয়ারহেড তাদের পারমাণবিক শক্তিবহরে সংযুক্ত করে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে একাধিক সংবাদের জন্ম হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে একটি প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সংস্থা স্পুটনিক আমাদের জানাচ্ছে, ভারত সাফল্যের সঙ্গে পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য অগ্নি-২ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। ওড়িশা রাজ্যের বালাসোরে অবস্থিত আবুল কালাম দ্বীপের ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি থেকে এই পরীক্ষা চালানো হয়। অগ্নি-২ ক্ষেপণাস্ত্রটি এক হাজার ২৪২ মাইল দূরে অবস্থিত শত্রুঘাঁটিতে হামলা চালাতে সক্ষম।  স্পুটনিক আরো জানাচ্ছে যে ভারত অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে বর্তমানে গবেষণা করছে, যা কিনা সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ও ছয় হাজার ২০০ মাইল দূরে অবস্থিত শত্রুর টার্গেটে আঘাত করতে পারে।ভারত-পাকিস্তান দু’টি দেশ ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনমুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলো এবং স্বাধীনতা অর্জন কালীন সময় থেকেই উভয় দেশের মধ্যে বড় ধরনের তিক্ততার ও শত্রুতার সৃষ্টি হয়েছিলো এবং এক পর্যায়ে ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে দেশ দু’টি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো। এরপর থেকে উভয় দেশের মধ্যে সংঘাত, সংঘর্ষ, সীমান্ত যুদ্ধ, বড় আকারের যুদ্ধ ইত্যাদি চলে আসছে। মাঝে মধ্যে বৈরী দেশ দু’টির মধ্যে বৈরিতা অবসানের জন্য চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, স্থায়ী শান্তি ও মিত্রতা কখনো স্থাপিত হয়নি উভয় দেশের মধ্যে। এ কারণে বিশেষজ্ঞজনেরা বলেন, দেশ দু’টির মধ্যেকার বৈরীতা ও শত্রুতামূলক সম্পর্ক হলো জন্মগত।ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার এই জন্মগত বৈরীতা উভয় দেশের মধ্যে চির শত্রুতার ও চির প্রতিদ্বন্দ্বীতার ও প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কের সৃষ্টি করেছে। দেশ দু’টি পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন ও মজুতকরণে প্রতিযোগিতামূলকভাবে আত্মনিয়োগ করার কারণে উভয় দেশই এখন পারমাণবিক সমরাস্ত্রের অধিকারী হয়েছে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী উভয় দেশের মধ্যে চির শত্রুতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকার কারণে এবং কাশ্মীর ও সীমান্ত নিয়ে চরম বিরোধ অব্যাহত থাকায় দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম একটি বিপজ্জনক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেছেন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। পাক-ভারত রাষ্ট্রের মধ্যেকার দীর্ঘ ও স্থায়ী শত্রুতামূলক সাংঘর্ষিক সম্পর্ক গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ওপর কালো ছায়া ফেলেছে এবং এ অঞ্চলের, এমনকি, বিশ্বব্যবস্থার শান্তি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রতি বড় ধরনের হুমকি হয়ে আছে বিগত সাত দশকেরও অধিককাল সময় ধরে।ভারত বরাবরই দাবি করে আসছে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পাকিস্তান থেকে প্রেরিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী জঙ্গিরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে অনুপ্রবেশ করে ভারতের সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প, গাড়ী ইত্যাদি সহ নানা স্থাপনায় হামলা চালিয়ে স্থাপনা ধ্বংস করছে, মানুষ হত্যা করছে এবং এভাবে একটা অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি করেছে এবং এর সর্বশেষ উদাহরণ হলো পালওয়ামায় ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে ভারতীয় সামরিক যানের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। ভারত বলছে, পাকিস্তানের সন্ত্রাসী সংগঠন জৈইশ-ই-মোহাম্মদ এ হামলার জন্য দায়ি। সন্ত্রাসী এ হামলার প্রতিক্রিয়ায় দেশ দু’টির মধ্যে এখনো অবধি যুদ্ধের ঝুঁকি রয়ে গেছে।পাকিস্তান অবশ্য ভারতের উত্থাপিত অভিযোগ সব সময়ই অস্বীকার করে আসছে। বরং সংকটের জন্য ভারতকে দোষারূপ করছে। দেশ দুটির পাল্টাপাল্টি এই অবস্থান দু’টি রাষ্ট্রকে সর্বদাই যুদ্ধের হুমকিতে রেখে দিয়েছে-যা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও উন্নয়ন বিষয়ে জটিল চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক সমরাস্ত্র সম্পন্ন শক্তিশালী দু’টি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তান আবারো সশস্ত্র সংঘাতের মুখোমুখি। যেকোনো সময় যুদ্ধ, পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে দেশ দু’টির মধ্যে-এমন আশংকা বিদ্যমান। যদিও পরিস্থিতি এখন কিছুটা শান্ত রয়েছে। তবে মাঝে-মধ্যেই সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে দেশ দু’টির সশস্ত্র বাহিনী।উল্লেখ্য কাশ্মীর ছিলো একটি রাজন্য শাসিত স্টেট এবং গোলাব সিংহের উত্তরাধিকারী হরি সিংহ ১৯৪৭ সালে এই স্টেটের শাসক ছিলেন। বৃটিশরা ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ ত্যাগ করে চলে যাবার পরবর্তী দুই মাসেও হরি সিংহ কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি তার স্টেট ভারত না পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে, নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে। হরি সিংহের এই সিদ্ধান্তহীনতাই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চির শত্রুতার উৎস হয়ে এখনো অবধি বিদ্যমান আছে। এটি উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে অমীমাংসিত সংকট হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলকে সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে এবং উভয় রাষ্ট্রকে যুদ্ধমান অবস্থায় রেখেছে।হরি সিংহের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কাশ্মীর দখলে নেবার জন্য ভারত ও পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধের সমাপ্তি হয় এবং যুদ্ধ সমাপ্তির চুক্তিতে কাশ্মীর বিভক্ত করে লাইন অব কন্ট্রোল (এলওসি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। এই বিভক্ত কাশ্মীরের এক অংশ যায় ভারতের অধীনে এবং এক অংশ যায় পাকিস্তানের অধীনে।জাতিসংঘের প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছিলো, গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরিদের মতামতের ভিত্তিতে কাশ্মীরের ভবিষ্যত নির্ধারণ করা হবে। তবে বাস্তবতা হলো, সেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি এখনো। গণভোট না হওয়াটা সংকট জিইয়ে রেখেছে দেশ দুটির মধ্যে।কাশ্মীর সংকটের আরো একটা কদর্য এবং সংঘাতের অন্যতম বিষয় হলো সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও জঙ্গিবাদ।  কিন্তু উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস ও দোষারূপ করার প্রবণতা।ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক যতই জটিল ও শীতল হচ্ছে, দেশ দুটির মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন ও মজুতকরণের প্রতিযোগিতা ততই বেড়ে চলেছে এবং একই সাথে, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করে চলেছে। উভয় দেশ বহির্বিশ্ব থেকে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রাদি ক্রয় করে অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করে চলেছে। সামরিক খাতে এই ব্যয় বৃদ্ধি, অস্ত্র ক্রয় ইত্যাদি খাতে ব্যয়িত অর্থ অবশ্যই দেশ দু’টির অন্যান্য উন্নয়ন ও মানবকল্যাণ খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।অর্থাৎ দু’টি রাষ্ট্রের জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সামরিক ও অস্ত্রাদি প্রতিযোগিতার কারণে; সে সাথে বাড়িয়ে তুলছে যুদ্ধের ঝুঁকি। ফলে দেশ দু’টির মধ্যে যেমন নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।১.৬৭ বিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত দক্ষিণ এশিয়া এমন একটি অঞ্চল, যা সামরিক ও ভূকৌশলগত কারণে আমেরিকা, চীন ও রাশিয়ার মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। ফলে এ অঞ্চলে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এ অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য বৃহৎ শক্তিগুলো নানাভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য তৎপর আছে। এতে করে এ অঞ্চলে একটা নতুন শক্তি সমীকরণ লক্ষণীয় হয়ে ওঠেছে।অত্রাঞ্চলে চীনের উত্থানকে ঠেকিয়ে দেবার জন্য যেমন আমেরিকা, তেমনি ভারতও তৎপর। ফলে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে একটা সামরিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছে।  ভারত এ অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে দু’টি লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে, সেটি হলো-নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শক্তির মর্যাদা অর্জন এবং অন্যটি হলো-পাকিস্তান ও চীনের প্রভাব খর্ব করা। আর আমেরিকার উদ্দেশ্য হলো দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রভাব অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি করা।অন্যদিকে, চীন আঞ্চলিক শক্তি থেকে বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে এবং এক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে আমেরিকা এবং ভারত। অন্যদিকে, বিশ্বশক্তি হওয়ার জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বৃদ্ধি করা ও চীনের অন্যতম উদ্দেশ্য। চীনের এই উদ্দেশ্য পূরণে পাকিস্তান বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের সাথে চীনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অংশীদারিত্ব বহু বছরের এবং বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার আলোকে চীন পাকিস্তানের সাথে সে সম্পর্ক আরো গভীরতর করে চলেছে।তাই দেখা যায়,ভারতকে আধুনিক শক্তি সম্পন্ন করতে আমেরিকা হাল ধরেছে এবং অন্যদিকে, চীন পাকিস্তানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বৃহৎ শক্তিগুলোর সমর্থনের দরুন পাকিস্তান ও ভারত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে বলে গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।ফলে, উভয় রাষ্ট্রের সামরিক প্রতিযোগিতা, উভয় দেশের জন্য যেমন, তেমনি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ভয়াবহ এক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যা হবে অপূরণীয় ক্ষতি। উভয় দেশের আদি বৈরিতার মূল কারণ হলো অমীমাংসিত কাশ্মীর ইস্যু এর সাথে যুক্ত হয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ।উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে চির বৈরিতার মূল উৎস হলো বৃটিশ শাসিত প্রিন্সলে স্টেট কাশ্মীর।

লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ