March 19, 2019

কোন পথ বেছে নেবেন নুরু? সুলতান মনসুরের পথ? নাকি জনতার পথ?

মোবায়েদুর রহমান : ডাকসু এবং হল ইউনিয়ন সমূহের নির্বাচন গত ১১ মার্চ সোমবার অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই নির্বাচনেও জাতীয় নির্বাচনের মতো কি রকম ভোট ডাকাতি হয়েছে সেটি নিয়ে পত্র পত্রিকায় এই কয়দিন ধরে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। একাধিক হলে আগে ভাগেই সীল মারা ব্যালট দিয়ে বাক্স ভরে রাখা, খালি ব্যালট দিয়ে ট্রাঙ্ক ভরে রাখা, লাইন জ্যাম করা, অন্য ভোটারদের বিশেষ করে অনাবাসিক ভোটারদের লাইনে ঢুকতে না দেওয়া, একাডেমিক ভবনে না করে হল সমূহে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা, ইত্যাদি হরেক রকমের অনিয়মের কথা আপনারা এই কয়দিন থেকে শুনে আসছেন। সুতরাং আমি ওগুলোর চর্বিত চর্বনে আর যাবো না। আমার মনে যে নতুন শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে সেটি নিয়েই আজ দুটো কথা বলবো।

আমার শঙ্কা, নব নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুরুকে নিয়ে। আপনারা হয়তো বলবেন, তাকে নিয়ে শঙ্কা কেন? আছে, কারণ আছে। তার আগে আপনাদেরকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের গল্প বলি। আপনারা জানেন, আমি সরাসরি রাজনীতি করি না। সরাসরি কোনো দলও করি না। তবে অবশ্যই আমার একটি রাজনৈতিক আদর্শ এবং মতবাদ আছে।

আপনরা জানেন যে, ঐক্যফ্রন্টের আগে কিন্তু বিএনপি কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছিল। যুক্তফ্রন্টের প্রধান করা হয়েছিল ড. বি চৌধুরীকে। শরীক দল ছিল আসম রবের জেএসডি এবং মান্নার নাগরিক ঐক্য। বিশ^াস করুন, পরদিনই আমি যুক্তফ্রন্টের হাইকমান্ডের দু জন নেতাকে বলি যে, আপনরা বিরাট ভুল করলেন। কারণ বৃদ্ধ বয়সে বি চৌধুরী চালিত হন তার পুত্র মাহি বি চৌধুরী কর্তৃক। এই মাহি বি চৌধুরীর রাজনৈতিক চরিত্র স্বচ্ছ নয় এবং সে সব সময় ব্যক্তি স্বার্থে পরিচালিত হয়। যুক্তফ্রন্টে সে এ্যাসেট না হয়ে লায়াবিলিটি হবে। আপনারা দেখেছেন, হয়েছেও তাই। জামায়াত ইস্যু নিয়ে এবং পার্লামেন্টে আসন বরাদ্দের ভারসাম্য নিয়ে সে প্রবলেম সৃষ্টি করে। তখন বি চৌধুরীর নেতৃত্ব অপসারণ করে বিএনপি এবং তার শরীক দুটি দল ড. কামাল হোসেনের শরণাপন্ন হয়। যুক্তফ্রন্টের নতুন নাম হয় ঐক্যফ্রন্ট। কামাল হোসেন এই ঐক্যফ্রন্টে সুলতান মনসুর কাদের সিদ্দিকী প্রমুখকে আনেন।
আমি আবার বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের এক শরীক- এই দুটি দলের সিনিয়র নেতাকে বলি যে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট আবার ভুল করলো। কারণ রাজনীতিতে ঐক্যমোর্চা বা ঐক্যজোট হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শ নিয়ে হয় না। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এক সাথে যায় না। তেমনি সমাজতন্ত্র ও ইনসাফ এবং ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ এক সাথে যায় না। বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট এমন কোনো নেতার সাথে একমঞ্চে উঠতে পারেনা যারা ২৪ ঘন্টা মুজিব কোর্ট পরে থাকে, বিএনপির মঞ্চে দাঁড়িয়ে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ চিরজীবী হোক, বলবে। কারণ এগুলো বাংলাদেশ জিন্দাবাদের আদর্শের সাথে এক সাথে যায় না। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এমন সব ব্যক্তিকে একই মঞ্চে দাঁড় করানো হয় যারা যে যার মতো দলীয় স্লোগান দিতে থাকে। যার যে মতই থাকুক না কেন, বেগম জিয়ার মতো অবিসংবাদিত নেতা আজ কারা নির্যাতিত। তার মুক্তি চাইতে যাদের কুন্ঠা তাদের সাথে বিএনপির ঐক্যজোট হয় কিভাবে?

সুলতান মনসুর বা মোকাব্বির এমন কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা নন যে মানুষ তাদেরকে ভোট দেওয়ার জন্য হামলে পড়বে। ঐক্যফ্রন্টের ২৯২ জন হেরে গেলেন। কিন্তু মনসুর এবং মোকাব্বির জিতলেন। মাজেজা কি? তারা কি জনগণের ভোটে জিতেছেন? নাকি তাদেরকে জিতিয়ে আনা হয়েছে? ফল যা হবার তাই হয়েছে। মনসুর তার নেতা কামাল হোসেন, ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে শপথ নিয়েছেন। শপথ নেওয়ার পর বলেছেন যে, শেখ হাসিনা ঐক্যের যে ডাক দিয়েছেন সেই ঐক্যকে শক্তিশালী করতে হবে। বিশ^াস ঘাতকতা বা বেঈমানির প্রকৃষ্ট নজির সৃষ্টি করেছেন সুলতান মনসুর।

কিন্তু প্রশ্ন হলো কামাল হোসেন এই ধরণের মানুষকে নমিনেশন দিয়েছিলেন কেন? তিনি আরও ৩/৪ জনকে নমিনেশন দিয়েছিলেন। তাঁর এবং বিএনপির সৌভাগ্য যে ওরা জয়লাভ করেননি। জিতলেও এই কাফফারাই দিতে হতো।

এই পটভূমিতেই বিচার করতে হবে নুরুল হক নুরুর বিষয়টি। এখন প্রধান প্রশ্ন হলো, ভিপি হিসাবে নুরুল হক নুরুর শপথ গ্রহণ। তিনি বলেছেন, যারা তাকে ভোট দিয়ে ভিপি বানিয়েছেন তারা চাইলে তিনি শপথ নেবেন , আর তারা না চাইলে শপথ নেবেন না। যারা নুরুকে ভোট দিয়েছেন তাদের সকলকে কি তিনি আইডেন্টিফাই করতে পারবেন? পারবেন না। কারণ যে রেজাল্ট শিটের ভিত্তিতে তাকে ভিপি ঘোষণা করা হয়েছে সেই একই রেজাল্ট শিটের ভিত্তিতে জিএস এবং এজিএস সহ ছাত্রলীগের ২৩ জনকে ডাকসু প্রতিনিধি ঘোষণা করা হয়েছে। আজ নুরু যদি শপথ নেন তাহলে ঐ পুরো রেজাল্ট শিটই জাস্টিফাইড হয়ে যায়। শুধু তাই নয় ১৮ টি হলের রেজাল্ট শিটও জাস্টিফাইড হয়ে যায়। অথচ যত সংগ্রাম সেটি তো ঐ রেজাল্ট শিটের বিরুদ্ধেই। ১১ তারিখে যে নির্বাচন হয়ে গেল সেই নির্বাচনকে এক মাত্র ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ ছাড়া দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকলে ভুয়া এবং জালিয়াতির নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছেন। সেই জালিয়াতির নির্বাচনের ভিত্তিতেই হল এবং ডাকসুর রেজাল্ট শিট তৈরি করা হয়েছে। এখন নুরু যদি শপথ নেন তাহলে ঐ ভুয়া নির্বাচনও জাস্টিফাইড হয়ে যায়।

সুলতান মনসুর বলেছেন, যে তার এলাকার জনগণ তাকে ভোট দিয়েছে। তার কথা যদি গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির যে ২৯২ জন ২৯২টি নির্বাচনী এলাকা থেকে জয়লাভ করেছেন সেই ২৯২ জনের নির্বাচন ও জয়লাভও জাস্টিফাইড হয়ে যায়। তাই সুলতান মনুসরকে ঐক্যফ্রন্ট থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নুরুল হক নুরুর সামনে এখন বিরাট সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। সমস্ত ছাত্র সমাজ আজ নুরুর পেছনে ঐক্যবদ্ধ। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগ ছাড়া অবশিষ্ট সমগ্র দেশবাসি আজ নুরুর পেছনে ঐক্যবদ্ধ। নুরু যদি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পুন নির্বাচনের দাবিতে অটল থাকেন তাহলে হয়তো তার ওপর জেল জুলুম নেমে আসতে পারে। কিন্তু সরকার যদি তার বিরুদ্ধে দমন মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে তিনি সারা দেশে অপ্রতিদ্বন্দ্বি নেতা হিসাবে আবির্ভূত হবেন। দেখা যাবে যে বর্তমানের অনেক প্রতিষ্ঠিত নেতার জনপ্রিয়তাকেও তিনি ছাড়িয়ে গেছেন। আর যদি তার পা পিছলে যায় এবং তিনি শপথ গ্রহণ করেন তাহলে সুলতান মনসুরের মতো তিনি গণ ধিকৃত, ঘৃণিত এবং বিশ্বাসঘাতক হিসাবে চিহ্নিত হবেন। এখন কোন পথ তিনি বেছে নেবেন সেটি একান্তভাবেই নির্ভর করছে তার ওপর।

সর্বশেষ সংবাদ