May 23, 2019

শামিমার নাগরিকত্ব নিয়ে তুমুল বিতর্কে বৃটেন

রায়হান আহমেদ তপাদার : জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসে যোগ দেয়া মুসলিম যুবতী শামিমা বেগমকে নিয়ে লন্ডনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এখন অন্তঃসত্ত্বা। তার দাবি অনুযায়ী, তিনি ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি আরো তিনজন মুসলিম কিশোরিকে নিয়ে লন্ডন থেকে পালিয়ে গিয়ে সিরিয়ায় আইএসে যোগ দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি একটি শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছেন। সেখান থেকে লন্ডনে ফিরতে চাইছেন শামিমা। তিনি চাইছেন, তার সন্তান লন্ডনেই জন্মগ্রহণ করুক। কিন্তু তাকে কি বৃটেনে ফিরতে দেয়া উচিত? এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক বৃটেনে। জঙ্গী সংগঠন আইএস সারা বিশ্বে একটি আতঙ্কের নাম। ব্রিটেনবাসীর কাছে তো অবশ্যই। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে সেভেন ব্লাস্ট হিসেবে পরিচিত ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী বোমা হামলায় ৫৬ জন নিহত হয়েছিল। ব্রিটেনের ম্যানচেস্টারের বোমা হামলা ব্রিটেনবাসীর স্মৃতিপটে এখনও দগদগে ঘা হয়ে আছে। ২০১৭ সালের মে মাসে ম্যানচেস্টারে মার্কিন গায়িকা আরিয়ানা গ্রান্দের কনসার্টে আত্মঘাতী হামলা হয়েছিল। এতে নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ জন এবং অর্ধশতাধিকের ওপর আহত হয়েছিল। ব্রিটেনে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলার হুমকির মাত্রা তীব্র পর্যায়ে রয়েছে। এর মানে, যে কোন সময় হামলার ঘটনা ঘটতে পারে। এমনই একটি সময় জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত মানুষকে ব্রিটেনের জনগণ কতটুকু গ্রহণ করবে? বেথনাল গ্রিন একাডেমির শিক্ষার্থী শামিমা বেগম ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইএসে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য ছাড়েন। তখন শামীমার বয়স ছিল ১৫। এখন ১৯। মানুষ যত বড় অপরাধই করুক না কেন শেষ পর্যন্ত আশ্রয়স্থল থাকে নিজের ঘর ও পরিবার। সুস্থ একটি স্বাভাবিক জীবন, পরিবার, সমাজ ছেড়ে বিপজ্জনক একটি পথে পা বাড়ানো শামিমার অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।  উল্লেখ্য দুই সন্তান, স্বামী হারিয়ে শামিমা এখন ঘরে ফিরে আসতে চায়। যে মা-বাবা-ভাই-বোনকে ছেড়ে অজানা এ্যাডভেঞ্চারের পথে পা বাড়িয়েছিল শামিমা আজকে অসহায় হয়ে আবার সেই পরিবারের কাছেই সাহায্য চাইছে। শামিমা বর্তমান অবস্থায় ব্রিটেনবাসীর কাছে মানবিক আবেদনও করেছেন। প্রশ্ন এসে যায়, ১৫ বছর বয়স সমাজ-পৃথিবীকে বোঝার জন্য কতটুকু বয়স? এই বয়সটা কি ভুল করার বয়স নয়? বাংলাদেশে দেখেছি এ্যাডভেঞ্চারের আশায় ড্রাগসের মতো নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে এ বয়স থেকেই। এ বয়সের সন্তানের প্রতি বাবা-মা এবং পরিবারের দায়িত্ব অনেক বেশি। তাদের সঠিকপথে পরিচালিত করা এবং তাদের দিকে সর্বক্ষণিক লক্ষ্য রাখা সকল বাবা-মায়ের একান্ত দায়িত্ব। আইএসে যোগ দেয়া সাবেক ব্রিটিশ নাগরিক তানিয়া জয়া যিনি ৬ বছর আগে পালিয়ে এসেছিলেন সিরিয়া থেকে স্কাইয়ের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতকারে ব্রিটেনে মুসলিম রক্ষণশীল পরিবার সম্পর্কে বলেছেন, রক্ষণশীল পরিবারগুলো মানবতা এবং নিরপেক্ষতার মূল্যবোধ সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা দেয় না। পারিবারিক শিক্ষার কারণে ১৫ বছর বয়সে ‘মৃত্যুর পরেই আসল জীবন শুরু’ এমন ধারণার শিক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। ধারণাগুলো বাস্তবতা থেকে কত দূরে নিয়ে যেতে পারে একজন মানুষকে। ১৫ বছরের কিশোরীর জীবনে কি এমন কিছু ঘটেছিল? শামিমা যখন দুই বান্ধবীসহ আইএসে যোগদানের উদ্দেশে সিরিয়া যায় তখনকার সাক্ষাতকারে শামিমার বাবা-মা বিস্মিত হয়ে বলেছিল- তাদের মেয়ে এত বড় একটি সিদ্ধান্ত কিভাবে, কবে নিয়েছে এ সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই ছিল না।  গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই জঙ্গী সংগঠন আইএসে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে তুরস্ক হয়ে সিরিয়া পালিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ নাগরিক শামিমা বেগমকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে দেয়া উচিত কি উচিত নয় এ সম্পর্কে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম, বাংলা গণমাধ্যমসহ কমিউনিটি এবং ব্রিটিশ রাজনীতিবিদরা এ ব্যাপারে তুমুল বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। এর মাঝে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তিসহ জনমনে কয়েকটি প্রশ্ন বার বার উঠে এসেছে। আট বছরের গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এখন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জয়লাভের পথে। কিন্তু যে হাজার হাজার মানুষকে তিনি জেলে পুরেছিলেন, জিহাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের অনেককেই দলে টানতে পেরেছে। ক’দিন আগে সিরিয়ায় একটি শরণার্থী শিবির থেকে শামিমা বেগমের অডিও রেকর্ডিংসহ একটি প্রতিবেদন টাইমস অব লন্ডন পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে। এরপর স্কাই টেলিভিশনে একটি সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয় যেটি নেয়া হয়েছিল সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরে ব্রিটিশ কিশোরী শামিমা বেগম পুত্রসন্তান জন্ম দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই। দুটি সাক্ষাতকারেই শামিমা পরিবারের কাছে আবেদন করেছেন ব্রিটেনে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আত্মঅনুশোচনায় কেউ কেউ নীরবে ক্ষমা চাইছে আবার কেউ চাইছে না। তাছাড়া আইনের দৃষ্টিতে অপরাধীদের সাজা দেয়ার নিয়ম পৃথিবীতে আছে। ব্রিটেন সব সময় যেখানে মানবতার কথা বলে সেখানে ব্রিটেনের নাগরিক শামিমাকে নিজ দেশে ফিরে আসতে বাধা দেয়ার কথা বলছেন ব্রিটিশ হোম সেক্রেটারি। তিনি বলেছেন, তার সকল ক্ষমতার প্রয়োগ করে হলেও আইএসে যোগ দিতে পালিয়ে যাওয়াদের ব্রিটেনে ফেরানো ঠেকাবেন।  যুক্তরাজ্যের গেটওয়ে বিমানবন্দর থেকে প্রথমে তুরস্কে পৌঁছান শামিমা। তুরস্কে পৌঁছানোর পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সিরিয়ায় যান। সিরিয়ার শহর রাক্কায় কিছুদিন অবস্থানের পরে ২৭ বছর বয়সী এক ডাচ নাগরিকের সঙ্গে শামিমার বিয়ে হয়। ওই ব্যক্তি অন্য ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বিয়ের পর ওই ব্যক্তির সঙ্গেই ছিলেন শামিমা। কিন্তু দু’সপ্তাহ আগে তারা বাঘিজ থেকে পালিয়ে আসেন। কিন্তু সেখানে সিরিয়ান সেনাবাহিনী তার স্বামীকে আটক করে নিয়ে যায়। তারপর থেকে স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাত নেই তার। সুযোগ থাকলে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছে শামিমা। স্বামী জীবিত কি মৃত এখনও জানা যায়নি। ধরা গেল শামিমাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হলো এবং তার স্বামী জীবিত আছে। তখন স্বামী আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করবে না এবং ব্রিটেনের ওপর জঙ্গী কোন হামলার পরিকল্পনা করবে না এমন কোন নিশ্চয়তা কি দেয়া সম্ভব? তবে একটি বিষয়ে আশঙ্কা আছে- আইনী জটিলতার পর যদি শামিমাকে ব্রিটেনে ফিরিয়ে আনা হয় তাহলে ব্রিটেনে হেট ক্রাইম আরও বৃদ্ধি পাবে। শামিমার আবেদনের বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরেই ব্রিটেনের একটি শহরে আইএসে যোগ দেয়া একজনের পরিবারের সদস্যকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। লন্ডনের কিংস কলেজের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য স্টাডি র‌্যাডিক্যালাইজেশনের এক গবেষণা অনুযায়ী, পশ্চিম ইউরোপের দেশ ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার নাগরিক ইসলামিক স্টেটে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে সিরিয়া ও ইরাকে পাড়ি দিয়েছিল। ওই গবেষণা অনুযায়ী পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে প্রায় ১৮০০-এর মতো আইএস যোদ্ধা এখন পর্যন্ত ফিরে এসেছে।  আইএস পতনের দ্বারপ্রান্তে থাকলেও জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এখনও ইরাক ও সিরিয়ায় ১৪ হাজার থেকে ১৮ হাজার সৈন্য রয়েছে তাদের। এই জিহাদী তৈরির জন্য যারা কাজ করে, দলে লোক ভেড়ানোর কাজ করে, তারা মূলত বিভিন্নভাবে ব্রেন ওয়াশ করে। গত ২০ বছর ধরে ইন্টারনেটে এ ধরনের প্রোপাগান্ডা ভিডিওর ছড়াছড়ি। সে সব ভিডিওতে দেখানো হয়, কিভাবে বিশ্বের নানা জায়গায় মুসলমানরা অবিচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কিছু ভিডিওতে কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে বদলা নেয়ার উদাহরণ দেখানো হয়। ব্রিটেনকেও এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে ভবিষ্যত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। এই নাগরিকদের অপরাধের তদন্ত, ঝুঁকি মূল্যায়ন, বিচার এবং পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে। মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা কোন সমাধান নয়। ব্রিটেন কি শামিমাকে রাষ্ট্রহীন করতে পারে? জাস্টিস সেক্রেটারি ডেভিড গওকে বলেছেন ‘আমরা কাউকে রাষ্ট্রহীন করতে পারি না।’ জন্ম-বেড়ে ওঠা সবকিছুই শামিমার ব্রিটেনে। ব্রিটেনের কোন নাগরিক অন্য কোন দেশ থেকে নিজ দেশে ফিরে আসতে চাইলে আইনত নিজ দেশে ফিরে আসার অধিকার তার আছে। নিজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকলে ফিরে আসতে বাধা দেয়ার অধিকারও আছে কিন্তু এক্ষেত্রে শামিমা তার জন্মরাষ্ট্র ব্রিটেনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল কি-না সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। অন্যথায় তাকে ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র বাধ্য। শামিমার ভাষ্য মতে, কোন অপরাধে সে জড়িত ছিল না। কিছুদিন পূর্বে আমরা দেখেছি শেফিল্ড ক্রাউন কোর্ট ‘জিহাদী জন’ নামে পরিচিত আইএস সদস্যকে বিয়ে করতে চাওয়া এক ব্রিটিশ নারীকে সাড়ে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।  এমনকি আগের দুটি সন্তান অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অপুষ্টিজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছে। নবজাতক এ শিশুটির ভবিষ্যত কি হবে। সবকিছু জানার পরেও একটি শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া কতটুকু মানবিক? যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী জন্মদাত্রী মা ব্রিটিশ হলে সন্তান ও ব্রিটেনের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবে। কোন অপরাধের যেমন শাস্তি দেয়া যায় তেমনি নাগরিক হিসেবে নাগরিক সুবিধাও ভোগ করা যায়। বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ নাগরিকত্ব বাতিল ইস্যুতে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন বলে যে, বৃটেন নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে শুধু যদি দেখা যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রাষ্ট্রহীন হয়ে না পড়েন, যদি তার দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকে, অথবা সীমাবদ্ধ কিছু ক্ষেত্রে তার অন্য কোথাও নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার থাকে তখনই। তিনি ইঙ্গিত দেন, এক্ষেত্রে শামিমার নবজাতককে ভিন্নভাবে দেখা হতে পারে। তিনি বলেন, শিশুদের দুর্ভোগ পোহাতে দেয়া উচিত নয়। যদি কোনো শিশুর পিতামাতা বৃটিশ নাগরিকত্ব হারান তবে তাতে ওই শিশুর অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। শামিমা তার সন্তানকে বৃটেনে বড় করার অনুমতি দেয়ার জন্য বৃটিশ কর্তৃপক্ষকে সহানুভূতি দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন কিন্তু তিনি বৃটেনে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে দিয়েছেন গত সপ্তাহে দ্য টাইমসকে দেয়া প্রথম সাক্ষাতকারে। তাতে তিনি বলেছেন, জিহাদে যোগ দেয়ার জন্য তিনি অনুতপ্ত নন। তবে বিবিসিকে দেয়া সর্বশেষ সাক্ষাতকারে তিনি অধিক পরিমাণে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আশা করি বৃটেন বুঝতে পারবে যে আমি একটি ভুল করেছি। অনেক বড় ভুল করেছি। কারণ, ওই সময়টাতে আমার বয়স কম ছিল।

লেখক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

 

সর্বশেষ সংবাদ