August 24, 2019

ভাষাই স্বদেশ প্রেমের পরিচয়

রায়হান আহমেদ তপাদার : বছর পরিক্রমায় একে একে ১১টি মাস অতিক্রম করে আবার আমাদের মাঝে উপস্থিত হচ্ছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। আর একুশ মানে মায়ের মুখের হাসি-একুশ আমার মায়ের হাতের রংগিন কাঁচের চুড়ি-একুশ আমার প্রিয় ভাষায় স্বাধীণ মনের বুলি-একুশ আমার কৃষক ভাইয়ের একমুঠো ধান-একুশ আমার বাউল মনে সুরের ঐক্যতান।একুশ মানে ফাগুণের আগুন রাঙা ফুল-একুশ মানে লক্ষ্য নির্ভুল-একুশ মানে রফিক, শফিক, বরকত ও জব্বার-একুশ মানে বাঙালী জাতির অহংকার-একুশ মানে মায়ের মুখের ভাষা-একুশ মানে স্বপ্ন,সাধ ও আশা।একুশ আমার শ্বাস-প্রশ্বাস একুশ তাজা রক্ত-একুশ আমার প্রেম যমুনা একুশ আলোর নদী-একুশ আমার গোলাপ জরা কৃষ্ণচ‚ড়া ফুল-একুশ আমার পলাশ শিমুল বাংলা ভাষার মূল-একুশ আমার সবুজ নিশান স্বাধীনতার সুর।একটি দিন সাক্ষী হয়ে গেল সেই ইতিহাসের,কুড়ি থেকে ফুল হতে হতে ঝরে যাওয়া জীবনের শত বাঙালীর প্রানের দাবি আদায়ের আন্দোলনের,মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার।রাষ্ট্রভাষা বাংলা সাক্ষী আজ সেই গৌরবের।মায়ের ভাষার জন্য জীবন বাজি রাখার অনন্য ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ঘোষণা করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে।বাঙালির একান্ত গর্ব ও শোকের ঘটনাটি কেবল বাংলা ভাষা নয়, আদায় করে বিশ্বের সব মাতৃভাষার জন্য স্বীকৃতি।যে দিবস বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরাই পালন করত,এখন তা যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রে।স্মরিত হন বাংলা ভাষার জন্য শহীদ ও সংগ্রামীরা।  বাংলা ভাষার শহীদ মিনার স্থান পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সংক্রান্ত জাতিসংঘের অফিসিয়াল সাইটে।নিজের মাতৃভাষার প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি বিশ্বের সব জাতি এখন মনে রাখে বাংলা ভাষাকেও।কেবল কি একুশ তারিখ?গোটা ফেব্রুয়ারি মাসই কি এখন বাংলার ভাষার মাস নয়? ফেব্রুয়ারিজুড়েই মুখর থাকে ঢাকা, কলকাতা,আগরতলা,শিলচরের মতো বাঙালির কেন্দ্রভূমিগুলো মুখর থাকে দূরদেশের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদ গুলোও।একুশ যদি মাথা উঁচু করার দিন হয়,তাহলে ফেব্রুয়ারি মাসও নিশ্চয়ই মাথা উঁচু করার মাস।ফেব্রুয়ারি আদতে বাংলা ভাষার ফাগুন,বাংলা ভাষার বসন্ত দিন।রবীন্দ্রনাথের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, দেবো আর নেবো,মিলাবো আর মিলবো।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,যা সুন্দর,যা ভালো তার কোন দেশকাল নেই। একুশের আত্মদানের ভেতর দিয়ে আমরা জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসন পেয়েছি।এ জন্যই তো ভাষা শহীদের মাসে খবর পেয়েছি,জাতি সংঘ সদর দফতরের সামনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার অনন্য স্বীকৃতির নিদর্শন হিসেবে ভাস্কর্য স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় জীবনে সংযোজিত হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়।আন্তর্জাতিক গৌরব ও সাফল্যের এক নতুন সূচক।ভাষার জন্য লড়াই হয়েছে কমবেশি অনেক দেশেই।কিন্তু ভাষার জন্য অকাতরে রক্ত দিয়েছে শুধু বাঙালিরা।কোন জনগোষ্ঠীর ভাষাকে দমন করার প্রবণতা বর্ণবাদী চেতনার সমতুল্য। মার্কিন মহামানব মার্টিন লুথার কিংবর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নোবেল প্রাইজ পেয়েও উগ্রজঙ্গিবাদের হাতে জীবন দিলেন।পাকিস্তান সরকারও তো বর্ণবাদী সরকার ছিল। ওদের মর্মমূলে ছিল বাঙালি বিদ্বেষ। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ সাহেব এই বাংলায় সফরে এসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেছিলেন বাঙালি বিদ্বেষ থেকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাত্ররা তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে যান।বলেন,তিনি হিন্দু ছাত্রদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে না।এই তথ্য জানিয়েছেন লেখক-সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত তার একটি প্রবন্ধে (রক্তাক্ত বাংলা)।তাই কোন আত্মদানই কোন দেশকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা।তা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষের সম্পদ হয়ে যায়।এই তথ্য অবগত হয়ে বিস্মিত হয়ে যায় যে,পবিত্র বাইবেল ল্যাটিন থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন ইংরেজ ও ইউরোপীয় কয়েকজন মনীষী।ইংরেজ মহামানব টিনডেইল মনে করতেন,ঈশ্বর যদি আমাকে দীর্ঘজীবন দেন, তাহলে লাঙল ঠেলে যে যুবক চাষবাসে নিয়োজিত থাকে, তাকে আমি ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে অধিকতর জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে আপনার চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।টিনডেইল কথাগুলো বলেছিলেন গির্জার কর্তৃপক্ষকে লক্ষ্য করে।কেননা যাজকরা মনে করতেন,জনসাধারণ বাইবেলের সারর্মম বুঝতে অক্ষম।অতএব,মাতৃভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করার প্রয়োজন নেই।ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একুশের চেতনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য একুশের মর্যাদা ফুটিয়ে তোলার জন্য কবি, সাহিত্যিক,লেখক,সাংবাদিকরা তাদের লেখায় ভাষায় তুলে ধরেছেন বিভিন্নভাবে।বিশিষ্ট কলামিস্ট গাফফার চৌধুরীর চিরায়ত বাণী ছিল এই গানটি।এই স্মৃতি বিজড়িত মহিমা উজ্জ্বল মাসটি হলো ফেব্রুয়ারি মাস।৫২-এর ভাষা আন্দোলন বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত। এই দিনটি ইতিহাসে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে বেদনারও।সেই ছোটবেলায় যতবার গানটি শুনেছি,মনের অজান্তে একটা প্রশ্ন তবে কি ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনে শুধু আমাদের শহীদ ভাইদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল।আমাদের বোনেরা কি যায়নি এই সংগ্রামী আন্দোলনে।এরপর আস্তে আস্তে জানতে আমাদের বোনদের কথা।যারা গিয়েছিল এই সংগ্রামে এই আন্দোলনে আর অর্জনে।অর্থাৎ সব দেশের যাজক, পুরুহিত ও মোল্লারা একই রকম প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল।৭ম শতাব্দীতে বর্ণব্রাহ্মণরা বলেছিলেন যে, বালা ভাষায় দেবদেবীর গুণকীর্তন করলে রৌরব নরকে যেতে হবে। ষোড়শ শতাব্দীতে মোল্লারা বলেছিলেন, বাংলা ভাষায় যারা নবীকাহিনি রচনা করে তারা ‘মোনাফেক’।উনিশ শতকের নবাব আব্দুল লতিফ বললেন,’বাংলা ছোট লোকদের ভাষা আর উর্দু হচ্ছে অভিজাতদের ভাষা।পন্ডিত ড.নীরোদ চন্দ্র চৌধুরী মনে করতেন,বাংলা আবার একটা ভাষা না কি? আজকে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে ভাবছি, বঙ্গবিবেক আবুল ফজলের অমর গ্রন্থটির নামটি ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’।ভাষা আন্দোলনে আত্মদানের সার্বিক তাৎপর্য এই কথায় ধরা পড়েছে।ছাত্ররা প্রাণের ভয়ে বুক পেতে না দিলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার দুর্জয় সাহস না দেখালে,কাপুরুষতায় মাথা নত করলে বাঙালি জাতির ভরাডুবি ঘটত। আমরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতাম না, বোবা জাতিতে পরিণত হতাম।ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় তৈরি হয়েছে স্থায়ী শহীদ মিনার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাঙালি অধ্যুষিত জনপদে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় অস্থায়ী শহীদ মিনার।এই সংখ্যা কয়েক বছর আগে একশ’ ছাড়িয়েছে।শহীদ বেদিতে যেহেতু ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় বাংলা ভাষার দামাল ছেলেদের;বিশ্বজুড়ে শহীদ মিনার ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকে বাংলা ভাষার শতফুল’ বললেও অত্যুক্তি হয় না।কিন্তু শহীদ মিনার মানে কি নিছক ফুলেল বিষয়? এর কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে মাথা নিচু না করার ঋজুতা অন্য কথায় রয়েছে রাজনীতি,অর্থনীতি,কূটনীতিতে মাথা উঁচু করার শপথ।একুশের চেতনায় পরবর্তী সময়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সেই শপথেরই সফল বাস্তবায়ন দেখিয়ে চলেছে।একুশের শহীদরা সেই গোঁজামিল থেকে বাঙালি জাতিকে রক্ষা করেছে,কাপুরুষতার গ্লানি থেকে বাঁচিয়েছে।তাই তাদের আমরা স্মরণ করবো আত্মতৃপ্তির শৃঙ্খলে সীমাবদ্ধ হওয়ার জন্য নয়,সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য,দরকার হলে আরো রক্ত দিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করার জন্য।আবুল ফজলও বলেন,একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আমাদের ঐতিহ্যে পরিণত।এ ঐতিহ্য থেকে আমরা প্রেরণা সংগ্রহ করবো,সঞ্চয় করবো শক্তি ও সাহস।কিন্তু আমাদের পদক্ষেপ হবে সামনের দিকে,দৃষ্টি থাকবে ভবিষ্যতের পানে এবং আমরা এগিয়ে যাবো মহত্তর ত্যাগের নবতর সংকল্প বুকে নিয়ে।একুশের শপথ হবে অন্যায়ের কাছে মাথানত না করা।ধর্ম প্রচার করা ও মাতৃভাষার গুরুত্ব অস্বীকার করেননি,করেননি উপেক্ষা।তাই মহানবী বলেছিলেন,আমি আরব আমার ভাষা আরবি।আবুল ফজল বলেছেন,আমরা যদি বলি,আমরা বাঙালি বাংলা আমাদের মাতৃভাষা;তাহলে অধর্ম করা হবে না। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিও আমাদের জাতীয় জীবনে এই সংকট নেমে এসেছিল।ধর্মের সঙ্গে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সংঘাত বাধিয়ে দিয়েছিল।এ সংঘাত থেকে রক্ষা করেছে একুশের আত্মদান কারীরা।আত্মত্যাগের ওপর সভ্যতার ভিত রচিত হয়।এ কথা বললে ভুল হবে না যে,বাঙালির সভ্যতার ভিত রচিত হয়েছে একুশের শহীদের আত্মদানের ওপর ভাষাই মানুষকে মানুষ করে তোলে।নির্মম সত্য কথা।মানুষের যখন ভাষা ছিল না,তখন মানুষ ও পশুর সঙ্গে পার্থক্য ছিল না।মানুষের ব্যক্তি জীবন,সমাজ জীবন,রাষ্ট্রজীবন ও জাতীয় জীবনের বিকাশ ঘটে ভাষার মাধ্যমে। ভাষা মানুষের বেঁচে থাকার হাতিয়ার।এ হাতিয়ার কেড়ে নিতে চেয়েছিল শাসকরা রুখে দিয়েছিল ভাষা শহীদরা।যে,মানুষের মতো মানুষ হতে হলে চাই মাতৃভাষা,চাই নিজেদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি।প্রসঙ্গে বোধ করি সৈয়দ মুজতবা আলীর কথাটা স্মরণ করলে আবুল ফজলের কথার সার্থকতা পরিষ্কার হবে।বলেছেন মুজতবা আলী,একটি জনগোষ্ঠীর সকলেই দ্বিভাষী হয় না,হয় মুষ্টিমেয় কয়েকজন।তাই আবুল ফজল বলেন,একুশে ফেব্রুয়ারি ইতিহাসকে সফল করে তুলতে হলে মাতৃভাষা আর মাতৃভাষার সাহিত্যকে আমাদের জীবনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।করতে হবে তাকে সব জ্ঞানের বাহন।একুশের শহীদরা যুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে প্রমাণ করেছেন আমরা জাতি হিসেবে মহত্ত্ব ভ্রষ্ট নই,প্রাণহীন নই,জীবন্মৃত নই,প্রাণের যে বৈশিষ্ট্য তা আমাদের আছে।প্রাণ দিয়েই আমরা প্রাণের মূল্য রক্ষা করেছি, জীবন দিয়ে জীবনের মর্যাদা খাড়া করেছি। রক্ত দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছি।যারা মরতে জানে তাদের কেউ মারতে পারে না। একটা বইকে সুন্দর, নির্ভুল ও পরিপাটি করে উপস্থাপনের দায়িত্ব একজন প্রকাশকের। কিন্তু বিগত দিনে দেখা গেছে, নিম্নমানের কাগজ এবং ভুল বানানের কিছু কিছু বই লেখক, পাঠক উভয়ের জন্য বিরক্তিকর,ক্ষতিকর ও আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ ধরনের বইমেলায় যাতে প্রবেশ না করে, সেদিকে কর্তৃপক্ষসহ সবাইকে দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ বাইরে সুন্দর আর ভেতরে অন্তসারশূন্য। এমন বইমেলা কারোরই কাম্য নয়।আমাদের মনে রাখতে হবে,পূর্ণাঙ্গ মানুষ হওয়ার পথে ভাষা তার প্রধানতম হাতিয়ার।ভাষা মানে,মাতৃভাষা-কারণ এ ভাষা তার সহজাত। মানুষের মনের বিকাশ ঘটে, তার নৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে মাতৃভাষার মাধ্যমে।মাতৃভাষায় শিক্ষিতই শিক্ষিত।মানুষ কল্পনা করে, স্বপ্ন দেখে, প্রেমে,বিরহে অশ্রুবর্ষণ করে,বিদ্রোহে প্রতিবাদে জেগে ওঠে মাতৃভাষার মাধ্যমে।ধার করা ভাষায় পণ্ডিত হওয়া যায়,মানুষ হওয়া যায় না।

লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্টraihan567@yahoo.com

সর্বশেষ সংবাদ