December 15, 2018

ক্ষমতার স্রােতের পক্ষে নাকি চিরচেনা বিপরীতে মৌলভীবাজার-২ আসন?

শাকির আহমদ : জাতীয় রাজনীতির মারপ্যাঁচে বারবার হোঁচট খায় কুলাউড়ার রাজনীতি নাকি জাতীয় রাজনীতির সিদ্ধান্ত কতটুকু শুদ্ধ বা অশুদ্ধ তা বিচার করে কুলাউড়ার মানুষ। এমন সমীকরনের দোলাচলে বিগত প্রায় ৩০ বছর। উত্তর দেয়ার মুখপাত্র কুলাউড়ার ভোটাররা নিজেদের এলাকার উন্নয়ন এবং ক্ষমতাকে বলি দিয়ে বারবার বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে। গত ৭টি জাতীয় নির্বাচনের একবার বাদে বাকি ৬ বারই তাঁরা (ভোটাররা) ক্ষমতায় আসীন দলের তোয়াক্কা না করে স্রােতের বিপরীতে তাদের রায় দিয়েছেন। তবে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র তকমার বাইরে গিয়ে গঠিত হয়েছে মহাজোট বনাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি’র নিজস্ব কোন প্রার্থী একাদশ নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন না। তবে বিএনপি সমর্থিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করছেন গণফোরামের প্রার্থী সাবেক সাংসদ, সাবেক ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। এবং আওয়ামী লীগের সমর্থিত মহাজোট থেকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করছেন বিকল্পধারার প্রার্থী সাবেক সাংসদ এম এম শাহীন।

স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর ৭ বার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে স্বতন্ত্র থেকে ২ বার, জাতীয় পার্টি থেকে ২ বার, আওয়ামীলীগ থেকে ১ বার, বিএনপি থেকে ১ বার প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সরকার গঠনের সময় এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ। ওই ১৯৯৬-২০০১ সালে কাঙ্খিত এবং প্রত্যাশার থেকেও বেশী উন্নয়ন হয়েছিলো কুলাউড়ায়। কিন্তু এর আগে-পরে ব্যক্তি নির্ভর প্রার্থী বিজয়ী হওয়ায় সরকার থেকে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পান নাই। ফলশ্রুতিতে কুলাউড়া বঞ্চিত হয়েছে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন থেকে। তবুও এখান কার ভোটারদের সাথে কথা বললে তারা জানান, ‘আমরা ঠিক কাজ করি, উনারা (দলীয় কেন্দ্র) যা সিদ্ধান্ত নিবেন তাই হতে হবে এমনতো কথা না। আমাদের পছন্দ-অপছন্দের মূল্যায়ন না করলে আমরাও উনাদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করতে দ্বিধাবোধ করবো না।’

কুলাউড়ার মানুষের এমন কঠিন মনোভাব আওয়ামীলীগ-বিএনপির নেতৃত্বস্থানীয়রা হয়তো বুঝেন কিন্তু উনারাও পড়েন নানাবিধ জটিলতায়। কারন এই কুলাউড়ার নেতারা নিজেদের পরিধি শুধুমাত্র দলকানা হিসেবে বিবেচ্য রাখতে রাজি না। তাঁরা নিজেদের স্বত্তা এবং ব্যক্তিত্বকে আলাদাভাবে ফোঁটানোর চেষ্টায় সর্বদা ব্রত।

জানা যায়, ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে কুলাউড়ার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন জাতীয় পার্টি থেকে নবাব আলী আব্বাস খান। যদিও সেই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিলো। এর পরের নির্বাচনে অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হন এমএম শাহীন। যদিও সেই নির্বাচনের ১৫ দিনের মাথায় পুনরায় নির্বাচনের ঘোষণা করা হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী সুলতান মোহম্মদ মনসুর আহমদ এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে এমপি নির্বাচিত হন এম এম শাহীন। যদিও ওই সময় বিএনপি ক্ষমতায় আসে কিন্তু অনেকটা কোনঠাসা ছিলেন তিনি। পরে ২০০৬ সালে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নিজে কুলাউড়ায় এসে এমএম শাহীনকে আবার দলে নেন।
২০০৬ সালে বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেন প্রেক্ষাপট আসলে আওয়ামীলীগ ও বিএনপির দুই নেতা সুলতান মোহম্মদ মনসুর আহমদ ও এম এম শাহীন বির্তর্কিত হয়ে পড়েন। তাদের গায়ে তকমা উঠে সংস্কারপন্থী হিসেবে। এই দুজনকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিজ দল থেকে মনোনয়ন দেয়া না হলে আবারও স্বতন্ত্র নির্বাচনে অংশ নেন এম এম শাহীন। তবে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ স্বতন্ত্র নির্বাচন না করলেও মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এর মনোনীত প্রার্থী নবাব আলী আব্বাস খানের পক্ষে ভোটের মাঠে নামেন। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে আবারও এমপি নির্বাচিত হন নবাব আলী আব্বাস খান।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের মনোনীত প্রার্থী মুহিবুল আলম চৌধুরী পিন্টুর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল মতিন। এবং স্বতন্ত্র প্রার্থ হিসেবে তিনি এমপি নির্বাচিত হন।

এবার বহুল আলোচিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নানা মোড় পরিলক্ষিত। বিভিন্ন ছোট-বড় দল দুটি রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত। এর একটি নিয়ন্ত্রণ করছে বর্তমান শাসকদল আওয়ামলীগ (মহাজোট)। আর অপর ধারা নিয়ন্ত্রণ করছে বিএনপি (জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট) যদিও কাগজে-কলমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. কামাল হোসেন। এই জোট-ফ্রন্টের মারপ্যাঁচে আবার হোঁচট খেলো কুলাউড়া। দুই বড় দল তাদের নিজেদের প্রার্থী উপেক্ষা করে বৃহৎ স্বার্থে প্রার্থী মনোনীত করেছে জোট-ফ্রন্ট থেকে। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গঠনের অন্যতম সমন্ময়ক ও ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা সুলতান মোহম্মদ মনসুর আহমদের মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিত হওয়ার পর বিএনপি নেতা এম এম শাহীন গিয়ে বিকল্প ধারা দলে যোগ দেন। উদ্দেশ্য মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত করা। সে যাত্রায় এখন পর্যন্ত তিনিও সফল।

জাতীয় রাজনীতির মারপ্যাঁচে তাদের এই পালাবদল কুলাউড়ার দলীয় নেতাকর্মীদের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হলেও ভোটারদের মনে নতুন করে উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। বেড়েছে ভোটারদের কদর। তবে ভোটাররা এখনো নিজেদের অবস্থান কিংবা মন্তব্য খোলাসা করছেন না। এতে প্রার্থীরা কিছুটা বিব্রত হচ্ছেন বোঝা যাচ্ছে। অনেকে সব প্রার্থীকে ‘সম্মতি’ সূচক আচরণ করলেও মনের ভেতরে সিঁল মেরে রেখেছেন, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দিব।’

সুতরাং আবার কুলাউড়ার মানুষ তাদের মতামত দিবেন স্বাধীনভাবে এটা মোটামোটি পরিষ্কার। আবারও কি স্রােতের বিপরীত ধারায় প্রার্থী নির্বাচিত হবেন নাকি দেশের স্রােতের সাথে তাল দিয়ে কুলাউড়ায় আসবে পরিবর্তন। দেখার অপেক্ষায় পুরো মৌলভীবাজার জেলা বাসী। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদের কারনে সারাদেশের চোখ থাকবে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে এটাও অনেকটা স্বাভাবিক।

সর্বশেষ সংবাদ