December 15, 2018

মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র দাসের আকুতি-এখন যুদ্ধ করছি বেঁচে থাকার জন্য

মাহফুজ শাকিল : মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র দাস। কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের রংগীরকুল গ্রামে জাতীর এই শ্রেষ্ঠ বীর সন্তানের বাড়ি। যিনি প্রবল শক্তি, সাহস, মনোবল আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে ১৯৭১ সালে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন ৪ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের অধীনে। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে গিয়ে পাল্টা আক্রমনের মুখেও পড়েছিলেন তিনি। পাক বাহিনীর মার্টারশেলের আঘাত থেকেও প্রাণে বাঁচেন। দেশ স্বাধীনের পর সিলেটে অস্ত্র জমা দিয়ে ফেরেন নিজ বাড়ীতে। মার্টারশেলের আঘাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেই প্রাণকে বর্তমানে আর বাঁচাতে পারছেননা মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র দাস (৬৫)। পরিবারে স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে চলছে তাদের সংসার। এক তো বয়সের ভার, তার উপর শরীরে বেঁধেছে নানা রোগ। এরই মধ্যে ৭ অক্টোবর গভীর রাতে হঠাৎ করে ষ্ট্রোক করেন হরেন্দ্র দাস। সেই ষ্ট্রোকে তাঁর শরীরের বাম হাত ও পা দুঠো নিস্তেজ হয়ে যায়। জানা যায়, রংগীরকুল গ্রামের মৃত অষ্টিনী দাসের কনিষ্ঠ ছেলে মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র দাস দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে ঠেঁলা চালিয়ে অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। নেই কোন তাঁর নিজস্ব ভূমি। সরকারী খাস তিন শতক ভূমির উপর একটি ঘরে বানিয়ে থাকেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা হিসেবে যে টাকা পান, সেটা দিয়ে কোনমতে একটি ঘর তৈরী করেছেন আর সংসার চালাচ্ছেন। ঘরের পুরো কাজ এখনো শেষ হয়নি। ঘরে নেই কোন বিদ্যুৎ। পাশ্ববর্তী বাড়িতে বিদ্যুৎ রয়েছে। হরেন্দ্র দাসের বাড়ি থেকে বিদ্যুৎ লাইনের দূরত্ব হবে ১৫০-২০০ ফুট। ঘরের পাশে বিদ্যুৎ লাইনের সংযোগ থাকলেও টাকার অভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছেন না। ঠেঁলা চালিয়ে কোনরকমে পরিবার নিয়ে খেয়ে বেঁচে আছেন। বয়সের ভার আর নানা অসুস্থতার কারনে বেশ কিছুদিন থেকে ঠেঁলা চালাতেও কষ্ট হয় তাঁর। এখন আবার হাত-পা পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। কি দিয়ে স্বামীর চিকিৎসা হবে আর কিভাবে খেয়ে বাঁচবেন, সেই চিন্তায় নির্বাক হয়ে ঘরের বারান্দায় বসে আছেন স্ত্রী শেফালী দাস।
সরেজমিন ১ ডিসেম্বর শনিবার সকালে তাঁর বাড়িতে গেলে দেখা যায়, হরেন্দ্র দাস ঘরের বাড়ান্দায় একটি চেয়ারে বসে আছেন। পাশে বসে একমাত্র সন্তান (মেয়ে) গীতা দাস বাবার পায়ে ঔষধ লাগাচ্ছেন। গীতা জানান, ৭ অক্টোবর রাত ২টার দিকে হটাৎ ষ্ট্রোক করেন তিনি। ওই রাতেই তাকে সিলেটের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোঃ শাকির আহমেদ শাহিনের অধীনে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় ৭ দিন চিকিৎসার পর ১৫ অক্টোবর রাতে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। ডাক্তার বলছেন আরও কিছুদিন থাকতে। কিন্তু টাকার অভাবে হাসপাতালে আর থাকা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ধার করে টাকা নিয়ে হাসপাতালের ১১হাজার টাকা বিল পরিশোধ করেছেন।
একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র দাস বলেন, ৭১ এ যুদ্ধ করেছি দেশের জন্য, আর এখন যুদ্ধ করছি বেঁচে থাকার জন্য। ঠেঁলা চালিয়ে কোনমতে চলছে পরিবার। কিন্তু ভালো কোন কিছু খাবার বা কেনার সুযোগ হয়না। আমার বাড়ি থেকে বাইরে যাবার কান রাস্তা নেই। একটি বাঁশের সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হয়। যেকোন সময় ঘটতে পারে বড় ধরণের দূর্ঘটনা। আমার ঘরে নেই কোন বিদ্যুৎ। অথচও যে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, সেই দেশে বাস করে এখন আমি বিদ্যুৎ ভোগ করতে পারছিনা। এটা চিন্তা করলে আমার মনে অনেক পীড়া দেয়। রাস্তা ও বিদ্যুৎ এর সমস্যা নিয়ে ৩বছর আগে স্থানীয় জয়চন্ডী ইউপি চেয়ারম্যান কমরউদ্দিন আহমদ কমরু ও উপজেলা ভারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুশীল দে কে জানিয়েছি। কিন্তুু এখনো কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। জয়চন্ডী ইউনিয়নের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা অমর আতিক বলেন, হরেন্দ্র দাস হলেন একজন অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা। আর্থিকভাবে সে খুবই দূর্বল। ৬৫ বছর বয়সে তিনি ঠেঁলা চালিয়ে অনেক কষ্ট করে পরিবার চালাচ্ছেন। কেউ থাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেনি। আমি নিজে হরেন্দ্র দাসের চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেছি। কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল লাইছ বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে মুক্তিযোদ্ধা হরেন্দ্র দাসের বাড়িতে বিদ্যুৎ ও রাস্তার ব্যবস্থা করে দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। বর্তমানে জরুরী ভিত্তিতে একটি সোলার স্থাপন করা হবে।

সর্বশেষ সংবাদ