December 15, 2018

‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত কুলাউড়ার নবাব বাড়ি

বিশেষ প্রতিনিধি : হায় হোসেন হায় হোসেন ধ্বনিতে আর নিজ শরীর রক্তাক্ত করে কুলাউড়ার পৃথিমপাশার শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানরা পালন করলো ১০ মহরম পবিত্র আশুরা। ২১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দেশের বিভিন্ন স্থানের ন্যায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পালন করে আসা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের নবাব বাড়িতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে দিবসটি পালিত হয়েছে। এবার হাতির বহর ছাড়াই পালন করা হয়েছে দিবসটি। অপরদিকে ১০ মহরম বেলা সাড়ে ৩টায় পৃথিমপাশা নাবাব বাড়ির হোসেনি দালান থেকে ধর্মী ভাবগাম্ভীর্য ও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে বের হয় সু-সজ্জিত তাজিয়া মিছিল। শিয়া সম্প্রদায়ের কয়েক’শ পুরুষ যুদ্ধের নানা অনুসঙ্গ, তাজিয়া, কালো, লাল ও সবুজ নিশান উড়িয়ে মিছিলে অংশ নেয়। পা নগ্ন রেখে মিছিলে অশংগ্রহণ কারীরা শোকের প্রতীক কালো পোষাক পরিধান করে। কারবালার নির্মম হত্যাকাণ্ড ও ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রাঃ) শাহাদৎ বরণের শোকে কাতর হয়ে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানরা ধারারো ছোরাগুচ্ছ রশিতে বেধে নিজের শরীরেকে অবলীলায় রক্তাক্ত করে। ফলে বুক ও পিঠ থেকে ঝরছে রক্ত।
কারো কারো কালো জামা রক্তে ভিজে চুপসে গেছে আর সাদা জামা হয়ে উটে রক্তে লালে-লাল। তবুও ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় আকাশ-বাতাস। তাজিয়া মিছিলে বুক চাপড়ে, জিঞ্জির দিয়ে শরীরে আঘাত করে প্রকাশ করে হয় মাতম। ১০ মহরম বেলা ৩টায় পৃথিমপাশা নবাব বাড়ির হোসেনি দালান থেকে তাজিয়া মিছিলসহ ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনিতে শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারীরা নিজের শরীর রক্তাক্ত করে মিছিলটি রবিরবাজার পদ্মাদিঘির পারের দিকে এগিয়ে এলে সেই মিছিলের সাথে যোগ দেয় তরফি সাহেব বাড়ির আলম মিছিল। উভয় মিছিল একত্রিত হয়ে রবিরবাজার পদ্মদিঘির পারে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে মহরমের সেই বিষাদময় দিনে ইমাম হোসেনের করুন মৃত্যুর প্রতিবাদে হায় হোসেন হায় হোসেন মাতম করে আবারও নিজের শরীর রক্তাক্ত করে কারবালার শোকে শোক পালন করা করেন।
এতে কঠোর নিরাপত্তার চাদরে বেষ্টিত ছিল পৃথিমপাশার নবাব বাড়ি। কুলাউড়ার অফিসার ইনচার্জ মোঃ শামীম মুসার নেতৃত্বে থানা পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তা জোরদার করে সর্বত্র। অনুষ্ঠানে কয়েক লক্ষ মানুষের পদচারনায় মুখরিত হয়ে উঠা ঐতিহ্যবাহি নবাব বাড়ি। স্পর্শকাতর জায়গায় মোতায়েন করা হয় একাধিক পুলিশ ও গ্রাম পুলিশ। পাশাপাশি র‌্যাবের কড়া নজরদারীতো ছিলোই। সবরকমের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুরো নবাব বাড়ি জুড়েই তৎপর ছিলো পুলিশ।
মিছিলে অংশ নিয়ে ধারারো ছোরাগুচ্ছ দিয়ে নিজ মাথা রক্তাক্ত করেন কুলাউড়া থেকে তিন বারের নির্বাচিত সাবেক এমপি এবং উক্ত অনুষ্ঠানের মোতাওয়াল্লী এড. নওয়াব আলী আব্বাছ খাঁন। তিনি জানান, আজকের এই দিনটির জন্য সারাবছর অপেক্ষায় থাকি। সেই ১২ বছর ধরে ধারালো ফলক দিয়ে পিঠে আঘাত করে আসছি।
তাজিয়া মিছিলে অংশ নেওয়া সৈয়দ আশফাক তানভীরের সাথে কথা হয়, আপনার শরীরে বেশ রক্ত ঝরছে, এটা অনেক কষ্টের কাজ না! জানতে চাইলে তানভীর জানান, ‘যিনি ইসলামের জন্য জীবন দিয়েছেন, তার জন্য রক্ত ঝরানো কোনো কষ্টের কাজ না। কথা বলেই ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ মাতম করতে থাকেন তিনি। ধারারো ছোরাগুচ্ছের আঘাতের ফলে পিঠ কেটে রক্ত বের হচ্ছে কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রক্ষেপ নেই। অপরদিকে ১ মহরম থেকে ১০ মহরম পযর্ন্ত নবাব বাড়িতে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে ছিল জিগির আজগার, কোরআনে তেলাওয়াত, মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, কাঙ্গালী ভোজসহ নফল নামায ও রোজা।
কথিত আছে প্রায় ১ হাজার ৩৩২ বছর আগে আরবি মহরম মাসের ১০ তারিখ মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেন (রাঃ) এবং তার ৭২ অনুসারীরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন। সে দিন থেকেই দিনটি অত্যন্ত তাৎপযর্ম শোকাবহ, হৃদয় বিদারক হয়ে উঠে মুসলিম উম্মার জন্য এবং সত্য ন্যায় ও ইসলামের আদর্শকে উর্ধ্বে তুলে ধরার দিন ১০ মহরম। এ দিনের শোক স্মৃতিকে স্মরণ করে নানা বিশে^র মুসলমানরা দিনটিকে পবিত্র আশুরা হিসাবে পালন করে আসছে।

সর্বশেষ সংবাদ