December 10, 2018

ডেথ হোটেল

Mua Kuvar Tiwari, 100yrs who is on her death bed waits to dye in the room of Mukti Bhavan in Varanasi. She has been brought by his son Munilal and her brother from neighbouring state Bihar, which they belive that if she dye in one of the rooms of Mukti Bhavan she will get Moksha.

Mua Kuvar Tiwari, 100yrs who is on her death bed waits to dye in the room of Mukti Bhavan in Varanasi. She has been brought by his son Munilal and her brother from neighbouring state Bihar, which they belive that if she dye in one of the rooms of Mukti Bhavan she will get Moksha.

মোহাম্মদ আবুল হোসেন : জন্ম নিলেই মানুষকে মরতে হবে। এ প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। এর বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা মানুষ বা কোন প্রাণীর নেই। সেই মৃত্যুকে অনেকে ভয় পান পরজীবনের কথা চিন্তা করে। কেউবা তাকে আলিঙ্গন করেন স্বর্গসুখের আশায়। তাই মৃত্যুটা যেন কোন পুণ্যভূমিতে হয় এমন মনোবাসনা থাকে কারো কারো। তাই তারা ছুটে যান সেখানে। জীবনের বাকিটা সময় সেখানেই কাটিয়ে দিতে চান। কেউবা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে ভাড়া নেন বাসা। একে অনেকে বলে থাকেন ‘ডেথ হোটেল’ বা মৃত্যু আলিঙ্গন করা হোটেল। এমন কথা শুনে অনেকেই বিস্মিত হতে পারেন। আবাসিক হোটেল আছে দুনিয়ায়। নানা রকম হোটেল আছে। কিন্তু মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য হোটেল ভাড়া! হ্যাঁ, এমন ঘটনা ঘটে আমাদের পাশের দেশ ভারতে।
সেখানকার উত্তর প্রদেশের বারানসিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পুণ্যভূমি হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তাই বৃদ্ধ বয়সে যখন কোন ব্যক্তি মৃত্যুর মুখোমুখি হন তখন সেখানে হোটেল ভাড়া নেয়া হয় তার জন্য। সেখানেই থাকেন তিনি বাকি সময়। মৃত্যু হয় সেখানেই। তারপর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও সম্পন্ন হয় সেখানে। এতে তার পরিবারও স্বস্তি পায়। এমনই একজন দীনেশ চন্দ্র মিশ্র। তার গায়ে তেলাপোকা, ইঁদুরে কাটা উলের কম্বল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি চলেছেন বারানসি। সঙ্গে নিয়েছেন একটি কেরোসিনের স্টোভ, রান্নার সরঞ্জাম, দরকারি কাপড়চোপড়। কারণ, তিনি জানেন না তাকে কতদিন বাড়ি ছেড়ে কাটাতে হবে বারানসিতে। দীনেশ সেখানে যাচ্ছেন তার অসুস্থ পিতাকে নিয়ে। তাদের বাড়ি বারানসির গোপালগঞ্জ গ্রামে। তার সঙ্গী হয়েছেন মা, বোন। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। এখন অবসরে গিয়েছেন। তাই মাসে মাসে পেনশন পান। সেই টাকা থেকে কিছুটা দিয়ে একটি গাড়ি ভাড়া করেছেন। তাতে করেই পিতাকে নিয়ে যাচ্ছেন বারানসি। বাড়ি থেকে বারানসির মূল টার্গেট বেশ দূর। এই সফর তার কাছে বেশ কষ্টের। কারণ, তিনি পিতাকে সেখানে নিয়ে যাচ্ছেন একটি মাত্র কারণে। তা হলোÑ তার মৃত্যু। বাড়িতে মৃত্যু হওয়ার চেয়ে বারানসিতে যদি মৃত্যু হয় তাহলে তা অনেক পুণ্যির বলে মনে করেন তিনি। তাই বার বার আবেগে আপ্লুত হচ্ছেন দীনেশ। অনেক বছর আগে তার পিতামহ, প্রপিতামহরা তাদের জীবনের শেষ দিনগুলো পার করেছেন এই বারানসিতে। যেখানে তারা মারা গিয়েছেন তার নামÑ কাশি রাব মুক্তি ভবন। বারানসিতে এমন দুটি বাড়ি টিকে আছে, যেখানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে মানুষ যায়। তারা সেই ভবনের কক্ষ ভাড়া নেয়। মৃত্যু হলেই সব শেষ। হিন্দুরা এই বারানসিতে মৃত্যু হওয়াকে ‘মোকশা’ হিসেবে দেখেন। এর অর্থ হলো পুনর্জন্ম চক্র থেকে মুক্তি। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন একজন ব্যক্তি তার জীবন গড়ে তোলেন কর্মের ওপর। এই কর্ম হতে পারে ভাল বা মন্দ, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। দীনেশ যে জাতের তারা বিশ্বাস করেন, বারানসিতে মৃত্যু হলে খারাপ কর্ম থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। এমনকি হত্যার ঘটনায়ও মোকশা পাওয়া যাবে। শিক্ষক দীনেশের বয়স এখন ৬৩ বছর। তিনি এই মুক্তি ভবনে তার দাদীর সঙ্গেও অবস্থান করেছিলেন দেড় মাস। তার দাদী তাকে দেখাশোনার জন্য দীনেশকে সেখানে তার সঙ্গে থাকার অনুরোধ করেছিলেন। তার কথা রেখেছেন দীনেশ। ওই ঘটনার তিন দিন পরে মারা যান তার দাদী। বারানসির এই যে বৈশিষ্ট্য তা প্রত্যক্ষ করতে বিদেশী পর্যটকের আনাগোনা লক্ষণীয়। সেখানে গঙ্গা নদীর তীরে যে ঘাট সেখানে তারা ছুটে যান। এই ঘাটগুলোতে পাকা সিঁড়ি। তা নেমে গেছে পানিতে। এই বারানসিতেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে দীনেশের পূর্বপুরুষদের। এখন তিনি এসেছেন তার পিতার শেষ ইচ্ছা পূরণে। যদি পিতার এই শেষ ইচ্ছে পূরণ করতে না পারেন তাহলে সারা জীবন নিজেকে অপরাধী মনে হবে। কিন্তু এ যাত্রা অতোটা সহজ নয়। একজন মৃত্যুপথযাত্রীর পাশে বসে থাকতে হয় সারাক্ষণ। অপেক্ষা করতে হয় কখন তিনি মারা যাবেন। তবেই বাড়ি ফেরা। দোটানায় পড়তে হয় তাদের। একদিকে বাড়িতে রেখে আসা পরিবার। অন্যদিকে মৃত্যুমুখে স্বজন। কাকে রেখে কার দিকে যাবেন! এমনই এক দোটানায় পড়েছেন দীনেশ। বাড়িতে রেখে এসেছেন স্ত্রী, একমাত্র কন্যাকে। বাড়িতে রয়েছে তার জরুরি প্রয়োজন। সেখানে তাকে ছাড়া সেই কাজ হচ্ছে না। তাই তাকে ফিরে যেতে হবে। যদি তিনি না ফেরেন তাহলে তার কন্যার জীবন বিপন্ন হতে পারে। চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে তার মেয়ের জীবন। এর কারণ কি? কারণ হলো, তার কন্যার বিয়ের সম্পর্ক এসেছে। ভাল পাত্র। যদি তিনি না যান তাহলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে তা। এমন হতে পারে যে পাত্রপক্ষ দেখে পছন্দ করেই বিয়ে সম্পন্ন করতে চাইতে পারে। এমন সময় পিতা হয়ে কিভাবে তিনি দূরে থাকেন! এমন চিন্তা কুরে কুরে খায় দীনেশকে। এই শহরের মুক্তি ভবন বা আশেপাশের ভবনগুলোতে এখন তেলের কুপি জ্বলে। এর স্থানীয় নাম দিয়াস। দিনরাত তা জ্বলে। কাসার বেল বাজে। শোনা যায় কোন প-িত বা পুরোহিত মন্ত্র জঁপছেন। এই বারানসিতে আছে ৩৬০০ মন্দির। দিন-রাত তাতে চলে পূজা অর্চনা। তারই শব্দ ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে বেড়ায় শহরের বাতাসে। যারা কাশিকে পুণ্যভূমি মনে করেন, যেসব পর্যটক এ শহরকে পছন্দ করেন তারা এর মাটি ছুঁয়ে দেখেন। গঙ্গার পবিত্র পানিতে গোসল করেন পবিত্রতা অর্জনের জন্য। তাই অনেকে মনে করেন এ শহর হলো আলোর শহর। এখানে জীবনের অন্যরকম অর্থ মেলে। কিন্তু তার চেয়েও খাঁটি কথা হলো এটি এখন মৃত্যুর শহরে রূপ নিয়েছে। এখানে কেউ মারা গেলে তাকে সাদা কাপড়ে ঢেকে দেয়া হয়। তারপর গলায় পরানো হয় কমলা গাদাফুল। তারপর সেই মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঘাটে। এই ঘাটের সিঁড়িগুলো আস্তে আস্তে নেমে গেছে গঙ্গার বুকে। সেখানে দাহ করার জন্য সবচেয়ে পবিত্র হিসেবে ধরা হয় মানিকারনিকা ঘাট। অনবরত সেখানে আগুন জ্বলছে। একের পর এক মৃতদেহ আসছে। ধারাবাহিকভাবে তা ওঠানো হচ্ছে চিতায়। আম কাঠের আগুনে সম্পন্ন হচ্ছে দাহ। বাতাসে তখন কটু গন্ধ। অনেক সময় চিতার আগুন নিভে গেলেও মৃতদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পড়ে থাকে। এর আশেপাশে যারা বাস করেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ডোম। তাদেরকে অনেকে আবার অনেক নিচু পর্যায়ের মানুষ হিসেবে মনে করে। নদীর ঘাটে থাকে জ্যোতির্বিদ ও পুরোহিতরা। নন্দন উপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি বারানসিতে অবকাঠামো নির্মাণের ব্যবসা করেন। তিনি জানেন প্রতি বছর এই মানিকারনিকা ঘাটে দাহ করা হয় ৩২ হাজার দেহ। তবে সংস্কৃতে পুরোহিতরা যে মন্ত্র পড়েন তার কতটা কাজে লাগে তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। গঙ্গায় গোসল করেন অনেক মানুষ। তারা মনে করেন এই গঙ্গাস্নানের মাধ্যমে তারা পবিত্রতা অর্জন করেন। কিন্তু সম্প্রতি শিল্পায়নের কারণে কল-কারখানার বর্জ্য, সুয়ারেজ লাইনের ময়লা পানি ও কসাইখানার রক্ত সরাসরি গিয়ে মিশছে গঙ্গায়। সেই পানিতে স্নান করে কিভাবে পবিত্রতা অর্জন করা যায় তা নিয়ে প্রশ্ন নন্দন উপাধ্যায়ের। তিনি প্রশ্ন করেন, কিভাবে এই পানি পবিত্র হয়? খাঁটি হয়?
বারানসির রাস্তায় একটু জায়গা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করে মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, পথচারী, গাড়ি, গরু। চারদিকের পরিবেশ, রাস্তাঘাটের এই অবস্থা দেখে অনেকেই ইদানীং আগ্রহ হারাচ্ছেন। কারো নিকট আত্মীয় এখন মুক্তি ভবনে মারা যাক তা কেউ কেউ চান না। এর কারণ, দুর্ভোগ। এই চর্চা এখন রুগ্ণ হয়ে আসছে। তারপরও মন মানে না। দীনেশের মতো অনেকেই পিতা বা মাতা বা এমন কোন আত্মীয়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে ছুটে যান বারানসিতে। উপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি বলেছেন, তার পিতা তাকে বলেছেন কর্মই হচ্ছে আসল। ভাল মানুষ হতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। যদি ভাল মানুষ হও তাহলে জীবন সেখানেই ভালোয় ভালোয় কেটে যাবে। সেখানে মৃত্যুর পরে কি পরিণতি হবে তা নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। অনেক মানুষ এখনও মৃত্যুর ব্যাপারে উদাসীন। এমন কথা চিন্তা করতে পারেন যেখানে একজন মানুষ অপেক্ষা করছে কখন তার পিতা মারা যাবেন। পিতা মারা না যাওয়া পর্যন্ত মুক্তি ভবন থেকে রেহাই মেলে না। যেমনটি হয়েছে দীনেশের বেলায়। বারানসির প্রায় সবাই জানেন মুক্তি ভবনের অবস্থান। এই ভবনটি কোথায়, কোন দিকেÑ এসবের কোন নির্দিষ্টতা নেই। কোন নির্দেশনা নেই। কোন সাইন বোর্ড নেই। কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে ওই দিকে মুক্তি ভবন। রাস্তায় মোটরসাইকেল, গাড়ি, রিকশার বিকট ভিড় সামলে সামনেই যখন মুক্তি ভবন মেলে তখন অবাক হতে পারেন অনেকেই। কারণ, মুক্তি ভবনের নামটা শুনলে যেমন একটি পবিত্র ভাব ফুটে ওঠে মনের পর্দায় আসলে সেটি তেমন নয়। এটা অতোটা পরিষ্কার নয়। স্বাস্থ্যসম্মত নয়। সংকীর্ণ একটি গলি ধরে এগুলে সামনে পড়বে কয়েকটি দোকান। সেখানে বিক্রি হয় স্পিকার, অডিও সরঞ্জাম। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বারানসির কোন সম্পদশালী তৈরি করেছিল ভবন। তাতে ইটের গাঁথুনি আর প্লাস্টারে ক্ষয় ধরেছে। ভবনগুলোর ভিতরে সিলিং অনেকখানি উপরে। রয়েছে খানিকটা খোলা জায়গা। কিন্তু এখন এ জায়গাটি আর তেমন নেই। চারদিকে কেমন স্যাঁতসেঁতে। পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। ভাঙা জানালা বা দরজার ফাঁক দিয়ে চোরের মতো এক চিলতে রোদ উঁকি মারে। সেই রোদে চোখ মেললে দেখা যায় বাতাসে উড়ছে ধুলোবালি। শুধু রাতের বেলা জ্বলে ওঠে আলো। তখনই শহর থেকে এখানে বিদ্যুৎ দেয়া হয়। মুক্তি ভবনে রয়েছে ১২টি রুম। এর ম্যানেজার ৬০ বছর বয়সী ভৈরবনাথ শুকলা। তিনিই লোকজনের জন্য করিডোরে ও মেঝেতে বিছানা বিছিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এখানে ৪৩ বছর তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। কোন ব্যক্তির প্রয়োজনের সময় পিছিয়ে যান না। তিনি একজন সেনা কর্মকর্তা হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তারপর হতে চেয়েছিলেন একজন শিক্ষক। কিন্তু এরই মধ্যে মাথায় চলে আসে বারানসিতে ঈশ্বরের ডাক। তিনি জীবনের বড় একটি সময় পাঠ করে কাটান হিন্দুত্ববিষয়ক লেখা।  এখন তিনি সিদ্ধান্ত দেন কখন একজন মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছায়। বলা হয়, এ বিষয়ে তার মধ্যে এক রকম আধ্যাত্মিকতা কাজ করে। তার মতে মুক্তি ভবন এমন কোন জায়গা নয় যে, কোন মানুষের যখন যাওয়ার জায়গা থাকে না সে বা তিনি এখানে এসে আশ্রয় নেন। এখানে আশ্রয় নেন যারা শান্তিতে মরতে চান। কাছের এবং দূরের মানুষরা এখানে আসেন। ভৈরবনাথ শুকলা দাবি করেন, তার মুক্তিভবনে মৃত্যু লাভ করার জন্য অতিথি এসেছেন ইংল্যান্ড ও মোরিতাস থেকে। তবে সবচেয়ে বেশি আসে পাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। যারা বিশ্বাস করে বারানসির পবিত্রতায় তারাই আসে এখানে। তারা যখন বারানসিতে পৌঁছেন তখন তাদের অনেকের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না অথবা প্রতিষ্ঠিত হোটেলগুলো তাদেরকে স্থান দেয় না। তারা ঠাঁই পান না গেস্ট হাউজগুলোতে। যখনই এসব স্থানের লোকজন বুঝতে পারেন তাদের অতিথি বিল পরিশোধ করতে পারবে না তখনই তাদেরকে বের করে দেয়। ম্যানেজার ভৈরবনাথ শুকলা বলেন, তার এখানে ওইরকম কোন ব্যাপার-স্যাপার নেই। তার কাছে যাওয়া মানুষ মারা না গেলে তিনি মনে করেন তারা মোকশা করছেন। মুক্তি ভবনের সামনের রুমটিকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি, যদিও তাকে এখানে খুব কম সময়ই দেখা যায় দিনের বেলা। তিনি এর আশেপাশে অবস্থানরত পুরোহিতদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করেন। তাদেরকে জড়ো করে রাতের বেলা আয়োজন করেন কীর্তন। দরজার কাছেই এ ভবনের নিয়মকানুন লেখা একটি বোর্ড আছে। তাতে হিন্দিতে নিয়মকানুন লেখা। তাতে প্রথম যে নিয়মটি লেখা তাতে বলা হয়েছে, যেসব মানুষ  কাশিতে মোকশায় বিশ্বাস করেন তারাই এখানে অনুমতি পাবেন। অন্য নিয়মের মধ্যে বলা হয়েছে, এ ভবনে শুধু হিন্দুরা অনুমোদিত। যেসব মানুষের দেহে সংক্রামক রোগ আছে তাদেরকে এখানে রাখা হবে না। কাউকে যদি সেখানে যৌনলীলায় মত্ত অথবা অন্য কোন পাপের কাজে লিপ্ত পাওয়া যায় তাহলে তাকে চলে যেতে বলা হয়। এখানে লজিং ফ্রি। কিন্তু অতিথিদের দিতে হয় শুধু বিদ্যুতের বিল। এখানে শুধু ১৫ দিন থাকার অনুমতি আছে। এরপরেই ম্যানেজার সিদ্ধান্ত নেবেন। রাতের বেলা শুকলা তার অফিসে একটি ছোট খাটের ওপর ঘুমান। একটি বুকশেলফে সাজিয়ে রাখা ধর্মীয় বই। তাতে ময়লা আবর্জনায় সয়লাব। প্লাস্টিকের জগে রয়েছে গঙ্গাজল। আর আছে একটি লেজার বই। কে এলেন, গেলেন তা তাতে লিপিবদ্ধ করা হয়। হাসতে হাসতে ভৈরবনাথ শুকলা বলেন, যদি কেউ এখানে মারা যান তখন পুরো বাড়িটা যেন ভৌতিক হয়ে উঠে। পুরো বাড়িতে ভূতে ভরে যায়। কিন্তু তারা মরে না। তারা মোকশা লাভ করে। তিনি যে লেজার মেনে চলেন তাতে দীনেশ মিশ্রর পিতার নাম গিরিশ লেখা রয়েছে। তিনি হলেন ১৪৫৪৪ নম্বর মৃত্যুকামী। তিনি এই মুক্তি ভবনে রয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ। মুক্তি ভবনের পিছন দিকে রুম নম্বর ৬। সেখান থেকে প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে আসেন দীনেশ মিশ্র। এখানে জানালাগুলো টাইট করে আঁটা। অতিরিক্ত ঠা-া বা সূর্যরশ্মি সহ্য করতে পারেন না দীনেশের পিতা গিরিশ মিশ্র। তিনি কাঠের তৈরি শক্ত খাটের ওপর নিথর পড়ে আছেন। দিনে একবার মাত্র তাকে তোলা হয়। তখন মা’র মুখে দেয়া হয় দুধ। দু’এক ঢোক গিলে খান নরম রুটি ও সবজি। কড়া রোদের মধ্যে বসে দীনেশ মিশ্র শৈশবের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবেন। কখনও ফিরে যান শিক্ষকতা জীবনে। তিনি অবসর নেয়ার আগে বিহারের একটি স্কুলে ৩০ বছর ধরে পড়াতেন ইংরেজি। নিজের অর্জনের জন্য তিনি কৃতিত্ব দেন তার পিতাকে।
পুুরোহিতরা প্রতিদিন সকালে চারঘণ্টা সময় কাটান রাম, কৃষ্ণ, হনুমান দেবতার পোশাক পরিবর্তন করাতে। তারপর তাদেরকে দুধ ও পানি দিয়ে গোসল করান। তারা ব্রাসের প্লেট, গ্লাস ধুয়ে পরিষ্কার করেন। ঈশ্বরকে খুশি করতে এমনটা করা হয়। ভৈরবনাথ শুকলা স্টিলের একটি বালতি নেন। তাতে কয়েক ফোঁটা গঙ্গাজল ফেলেন। তা নিয়ে চলে যান একটি টিউবওয়েলের কাছে গোসল করতে। যারা মুক্তি ভবনে কাজ করেন ও থাকেন তারা প্রতিদিন সকালে এখানে খোলা স্থানে গোসল করেন। সকালে একটু বেলা হলেই মুক্তি ভবনের স্টাফদের সন্তানরা নির্ধারিত পোশাক পরে ছুটে চলে বিভিন্ন স্কুলে। পুরোহিতরা ব্যস্ত হয়ে উঠেন। গাছে গাছে যে বানর এসে আড্ডা জমায়, ওয়ালের ওপর আড্ডা জমায় তাদের তাড়িয়ে দেন। এ সময় বাইরে থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না ভিতরে মৃত্যুর জন্য রুম রিজার্ভ করা আছে। এখানেই পিতার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন দীনেশ মিশ্র। এ নিয়ে তিনি এখানকার তিন পুরোহিতের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। তিনি বাইরে গিয়ে সবজি কিনে আনেন। তা নিয়ে ফেরার পর রান্না করেন তার বোন। কারণ, এখানে এই মুক্তি ভবনে কোন ক্যাফেটেরিয়া বা খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। এ কথা দীনেশ মিশ্র আগে থেকেই জানেন। আগে তিনি তার দাদীর সঙ্গে এখানে ছিলেন। তখনই এসব রীতিনীতির কথা জানতে পেরেছিলেন। এমনি করে দিন যেতে যেতে এক সময় দীনেশ মিশ্র অস্থির হয়ে পড়েন। তখন তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন ভৈরবনাথ শুকলা। তিনি বলেন, উদ্বিগ্ন হবেন না। আপনার পিতা তাড়াতাড়িই মারা যাবেন।
শুনতে খুব খারাপ লাগার কথা যে, একজন সন্তান অপেক্ষা করছেন কখন তার পিতা মারা যাবেন। কিন্তু মৃত্যু নিয়ে কোন পূর্বাভাস করা যায় না। তা না গেলেও শুকলা মনে করেন মৃত্যু মানে হলো মুক্তি। স্বাধীনতা। মুক্তি ভবনে তিনি ও অন্যরা বারানসিতে একটি মৃত্যুকে দেখেন ঈশ্বরের সঙ্গে একজনের আত্মার বিয়ে হওয়া হিসেবে। বিয়ের মতোই তারা এ সময়টা আনন্দ করেন। কিন্তু দীনেশ মিশ্রর কাছে এই মুহূর্তে কোন আনন্দ নেই। তিনি বলেন, আমি এখন উভয় সঙ্কটে।
বেশ কয়েক দিন তিনি শেফ করেন নি মুখ। তার নাকের ওপর ঝুলছে একটি চশমা। তাকিয়ে আছেন রোদের দিকে। তাতে ধুলোবালি উড়ছে। রীতি অনুযায়ী তিনি জানেন তার মেয়ের বিয়েতে তাকে থাকতেই হবে। যখন তিনি বারানসির পথে পা বাড়ান তখন তার মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে এক যোগ্য যুবকের পরিবার থেকে। তিনি মনে করেন তার অনুপস্থিতিতে সেই সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে। এ জন্য তিনি নিজেকে দায়ী করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি মেয়ে বন্দনার নতুন জীবনের সমঝোতা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলেন। পিতার মতো তিনি দায়িত্ববান। কিন্তু এখন মেয়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি কি তার পিতাকে একা একা এই শূন্য ঘরে রেখে যাবেন! এই নিয়ে তিনি উভয় সঙ্কটে। তিনি বলেন, আমি আর কয়েকটি দিন দেখবো। এরপরই আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমি মেয়ের বিয়েতে যাবো কিনা। তিনি বিশ্বাস করেন, তার অনুপস্থিতিতে বাড়িতে যারা আছে তারা তার কনের জন্য সব ব্যবস্থা করতে পারবে। তার অর্থ নেই। অনেক মানুষ আছে যারা তাকে অর্থ ধার দেবে। তাদের এখন এগিয়ে আসা উচিত তাকে ঋণ দিতে। এমন অনেক কথা ভাবেন তিনি। বিয়ের সময় কনে পক্ষকে অনেক অর্থসম্পদ খরচ করতে হয়। দীনেশ মিশ্র মনে করেন তার তিন সন্তানই স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ভারতে অনেক শিশু আছে যারা সেই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না। তার ছেলে একটি ভাল চাকরি পেয়েছে এতে তিনি গর্বিত। তার পরিবারে এখন মেয়েই প্রথম, যাকে বিয়ে দিতে হবে। পাত্র খুব হ্যান্ডসাম। তার আছে একটি ভাল সরকারি চাকরি। সে মদ পান করে না। আজকাল গ্রামের অনেক মানুষ মদ পান করে। তারপর স্ত্রীকে ধরে পিটায়। ওই ছেলের সেই অভ্যাস নেই। তার পরিবারও ভাল। দীনেশ মিশ্র বলেন, এ জন্যই আমি জরুরিভিত্তিতে বাড়ি ফিরতে চাই। তার কথা শুনছিলেন ম্যানেজার ভৈরবনাথ শুকলা। তিনি দীনেশ মিশ্রর সমস্যার কথা শুনে তাকে পরামর্শ দিলেন বারানসিতেই থাকতে। আপনার উচিত আপনার পিতাকে অগ্রাধিকার দেয়া তাই না। তিনি আপনার জন্ম দিয়েছেন। তার সামনে এখন অল্প সময় আছে। অন্য কাজের জন্য অনেক সময় পাবেন। দীনেশ মিশ্র তার পিতার প্রতি অনুগত। তাই এ পরামর্শকেও তিনি ফেলতে পারছেন না। এই মুক্তি ভবনে অনেকদিন ধরে একা গেস্ট দীনেশ মিশ্র। কিন্তু এক বিকালে শুনতে পেলেন আরেকজন গেস্ট আসছেন এখানে। শুনতে পেলেন একজন বয়স্ক নারীর সঙ্গে এক অতিথি এসেছেন। তারা ওই মৃত্যুপথযাত্রী নারীকে ভর্তি করিয়েছেন বারানসি হিন্দু ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে। মুক্তি ভবন থেকে এই হাসপাতাল কিছুটা দূরে। ওই নারীর অতিথিরা তাকে এই মুক্তি ভবনে নিয়ে আসতে চান। কারণ, চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছেন তাদের এখন আর তেমন করার কিছু নেই। ওই হাসপাতালটি বারানসিতে। কিন্তু প্রাচীন কাশির বাইরে। ভৈরবনাথ শুকলা বলছেন, যদি এই মুক্তি ভবনে কারো মৃত্যু হয় তাহলে ধরে নেয়া হয় যে, তার জন্য স্বর্গ অবধারিত। এই আশায় অনেক মানুষ তাদের স্বজনকে নিয়ে আসে। তারা এখানে স্বর্গীয় সুখ মনে করেন। এরই মধ্যে দুটি পরিবারকে ফিরিয়ে দিয়েছেন ভৈরবনাথ শুকলা। কোন ব্যক্তিকে মুক্তি ভবনে নেবেন কিনা তা আগে গিয়ে যাচাই করেন তিনি। দেখে নেন তার অবস্থা কি। তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছেছেন কিনা। যদি এমনটা হয় তাহলে তার লেজারে তার নাম লিপিবদ্ধ করে নেন। ব্যস ওই ব্যক্তি হয়ে যান মুক্তি ভবনের বাসিন্দা। ওদিকে হাসপাতাল থেকে রোগী আসতে অনেকটা সময় লেগে যায়। এরই মধ্যে শুকলা মনে করেন ওই রোগী হয়তো এরই মধ্যে গত হয়েছেন। তারপর সময় যেতে থাকে। সন্ধ্যার আগে আগে মাহিন্দ ব্রান্ডের একটি এসইউভি এসে ভেড়ে মুক্তি ভবনের গেটে। কমপক্ষে সাতজন মানুষ সে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। গাড়ির পিছনের সিটে বসা ১০৫ বছরের এক নারী। তার আত্মীয়রা শুকলাকে বললেন, তারা এই নারীকে তাদের গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন। এক মাসের বেশি সময় তিনি কোন কঠিন খাবার খান নি। সে তুলনায় দীনেশ মিশ্রর পিতার অবস্থা ভাল। তো ভৈরবনাথ শুকলা এগিয়ে গিয়ে ওই নারীকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং বললেন, এই নারী সর্বোচ্চ তিন দিন বাঁচবেন। একজন পুরোহিত এলেন। তিনি তাদেরকে দেখিয়ে দিলেন রুম নম্বর ৫। দীনেশ মিশ্রর রুমের পাশেই এ রুমটি তাদের জন্য নির্ধারিত। এর ভিতরে সাদা রঙ করা দেয়াল আর রয়েছে দুটি খাট। তারা দেখলেন এবং মেনে নিলেন। তারা যে নারীকে নিয়ে এসেছেন তিনি বিয়ে করেন নি। তার কোন ছেলেপুলে নেই। তিনি যখন চোখ বন্ধ করেন, তার পর থেকে আর তাকিয়ে দেখেন নি তখনই তার দিন শেষ এমনটা মনে করে বিহার থেকে এখানে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারই ভাইপো। তার নাম অরুণ কুমার তিওয়ারি। তিনি বললেন, তার পিসির প্রয়োজন দুনিয়ায় ফুরিয়ে গেছে। তিওয়ারি সঙ্গে করে যেসব বিছানাপত্র নিয়ে এসেছেন তা খুলে নিলেন। একটি খাটের ওপর বিছিয়ে দিলেন তা। তারপর তাতে শুইয়ে দিলেন তার পিসিকে। তার পা ঠিকঠাক উত্তর দিকে আছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিলেন। এখানে এই মুক্তি ভবনে মারা গিয়েছেন জয়শঙ্কর প্রসাদ তিওয়ারির এক নিকট আত্মীয়। তিনি শুধু পানির ওপর নির্ভর করে বেঁচেছিলেন কমপক্ষে ১৫ দিন। তার মতে, তিনি এখানে মারা গিয়েছেন এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মানে হলো আমি তার ঋণ শোধ করতে পেরেছি।

সর্বশেষ সংবাদ