December 10, 2018

অতিথি পাখির কলতানে মুখর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়

1408596717বিশেষ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড় এখন অতিথি পাখির মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। হাওড়জুড়ে অতিথি পাখিদের দলবদ্ধভাবে বিচরণের এমন দৃশ্য সহজেই আকৃষ্ট করছে আগত পাখিপ্রেমিকদের। তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার বিস্তীর্ণ নয় হাজার ৭২৭ হেক্টর এলাকাজুড়ে (নয় কুড়ি কান্দা আর ছয় কুড়ি বিল) বিস্তৃত এ হাওড়ের কানায় কানায় অতিথি পাখির কলতানে মুখর এখন।

জানা গেছে, প্রতিবছর নভেম্বর মাসের শুরুতে সুদূর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া, নেপালসহ শীতপ্রধান বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে ছুটে আসে এসব অতিথি পাখি। শীতের তীব্রতা থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে নানা প্রজাতির এসব অতিথি পাখি এসে দেশের হাতেগোনা কয়েকটি স্থানে ক্ষণস্থায়ী আবাস গড়ে। তারমধ্যে অন্যতম টাঙ্গুয়ার হাওড়।

শীতের তীব্রতা কমে আসতে থাকলে ফের ডানায় ভর করে ফিরে যায় নিজ গন্তব্যে। নানা রঙের পাখির কলধ্বনিতে মুখরিত এখন টাঙ্গুয়ার হাওড়। আগত পাখিদের মধ্যে কাইম, লেনজা, কালাকোড়া, পিয়ারী, পিংহাঁস, বালিহাঁস, গঙ্গাকবুতর, পাতিসরালি, জলময়ুর, ধসরবক, সাদাবক, ডুবুরি, জোবক ও পানকৌড়ি অন্যতম।

অপরদিকে মাছের অভয়াশ্রম আর পাখিদের অভয়ারণ্য হিসেবে আখ্যায়িত এ হাওড়ে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ ও নির্বিচারে বৃক্ষ-গুল্ম ধ্বংসের ফলে হাওড়ের পরিবেশগত ভারসম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এসব কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে মাছের পরিমাণ ও পাখির সংখ্যা এমনটাই জানালেন হাওড়পাড়ের বাসিন্দারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরে গৃহীত জলাভূমি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে বিশ্বজুড়ে যেসব এলাকা সংরক্ষণের তাগিদ দেওয়া হয়, সেগুলো রামসার সাইট হিসেবে পরিচিত। সুন্দরবনের পর টাঙ্গুয়ার হাওড় রামসার তালিকায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্থান। আর ২০০০ সালে রামসার সাইট তালিকায় এ হাওড়ের নাম ওঠে।

রামসার সাইট ঘোষিত হওয়ার পর থেকে সরকার হাওড়টির ব্যবস্থাপনায় কিছু উদ্যোগ নেয়। ২০০৩ সালের পর থেকে ইজারাপ্রথা বন্ধ করে হাওড়পাড়ের ৮৪টি গ্রাম নিয়ে গঠিত গ্রামবাসীকে ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা হয়। কিন্তু তাতেও বন্ধ হয়নি অবৈধভাবে মাছ শিকার, চলছে পাখি শিকারও। করচ, হিজল, নলখাগড়া উজাড় করার ফলে বিপন্ন হচ্ছে হাওড়ের পরিবেশ।

পাখি পর্যবেক্ষকদের দাবি, গত কয়েক বছরে এসব কারণে এ হাওড়ে পাখি কমেছে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। ২০০২ সালে এ হাওড়ে শুধু জলচর পরিযায়ী পাখি ছিল পাঁচ লাখের বেশি। অথচ গত দু-তিন বছরে মাত্র এক লাখের মতো পাখি রেকর্ড করা হয়েছে।

পদাধিকারবলে জেলা প্রশাসক হাওড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠন (আইইউসিএন) হাওড় রক্ষণাবেক্ষণের কাজে জেলা প্রশাসনকে এতো দিন সহযোগিতা করে আসলেও বর্তমানে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
হাওড় পাড়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, নজরদারির দুর্বলতায় হাওড়ে টহলরত পুলিশ, আনসার ও নৌকার মাঝি মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে প্রতিরাতে মাছ ও পাখি শিকার করার সুযোগ করে দেয়া হয়।

টাঙ্গুয়ার হাওড় কেন্দ্রীয় সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ হাওরপাড়ের জয়পুর গ্রামের বাসিন্দা আহমদ কবির বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্যের এই হাওড় রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারি আরো বৃদ্ধি করতে হবে। এছাড়া এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপিত হলে অবৈধভাবে মৎস্য আহরণ ও নির্বিচারে বৃক্ষ-গুল্ম ধ্বংস অনেকটা কমে যাবে।

জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, অতিথি পাখি নিধনের খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে অবৈধ মাছ শিকারিদের ধরে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

সর্বশেষ সংবাদ