September 19, 2019

অর্থমন্ত্রী মিথ্যা বলতে পারদর্শী

40854_f10অর্থনৈতিক রিপোর্র্টার : জনতা ব্যাংকের সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান ড. আবুল বারাকাত বলেছেন, অর্থমন্ত্রী মিথ্যা বলতে ব্যাপক পারদর্শী। তিনি বলেন, জনতা ব্যাংকের দায়িত্ব দেয়ার জন্য জায়ান্ট লোক খুঁজছেন তিনি। আসলে তিনি নব্য উদারবাদী দালাল কাউকে খুঁজছেন। যিনি কথায় কথায় বঙ্গবন্ধু বলবেন অথবা এমন একজনকে খুঁজছেন যিনি অর্থমন্ত্রীর চাটুকার হবেন। ব্যাংকের মূল আর্থিক সূচকের উন্নতির চিত্র তুলে ধরে বারাকাত বলেন, জনতা ব্যাংকের ‘অবক্ষয়ে’র কথা বলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘মিথ্যাচার’ করেছেন। এজন্য তাকে ব্যাংকের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। তিনি দেশের জন্য ক্ষতিকর। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘জনতা ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতার পাঁচ বছর: ২০০৯-২০১৩’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ড. আবুল বারাকাত এসব কথা বলেন। এ সময় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. মহিউদ্দিন, একেএম কামরুল ইসলাম, সঙ্গীতা আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। আবুল বারকাত বলেন, অর্থমন্ত্রীর দেশপ্রেম নেই। তিনি এলিটিস্ট আঞ্চলিকতায় বিশ্বাসী। তিনি দরিদ্রদের জন্য নয়, অভিজাত শ্রেণীর জন্য কাজ করছেন। এমনকি পরিবারতন্ত্রে অর্থমন্ত্রী প্রথম স্থান অধিকার করেছেন বলেও মন্তব্য করেন আবুল বারকাত। তার পরিবারের সদস্যরা অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্ব পদে আসীন রয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে তিনি বেশি তৎপর। অর্থমন্ত্রী নিজের এলাকার দরিদ্রদের দেখেন না অথচ উচ্চবিত্তদের জন্য এমন কোন কাজ নেই, যা তিনি করেন না। অন্য এলাকার মানুষের সঙ্গে তিনি বৈষম্যমূলক আচরণ করেন। তিনি এমন কিছু তদবির করেন, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
আবুল বারকাত বলেন, অর্থমন্ত্রী বুদ্ধিভিত্তিক জালিয়াতি করেন। তিনি অবলীলায় মিথ্যা কথা বলেন। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জনতা ব্যাংকের সিএসআর কর্মসূচির ওপর একটি বইয়ে অর্থমন্ত্রী লিখেছেন, সিএসআর কর্মসূচিতে জনতা ব্যাংক অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, অথচ এখন তিনি বলছেন, সিএসআর ব্যয় সম্পর্কে তিনি জানেন না। আবুল বারকাত বলেন, ব্যাংকের প্রতি বছরের ব্যয়ের একটি বাজেট অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, সেখানে সিএসআর খাতে কত ব্যয় হবে, তা উল্লেখ থাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনতা ব্যাংক সিএসআর খাতে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি পরিপালন করেছে।
চেয়ারম্যান হিসেবে মেয়াদ বৃদ্ধি না হওয়ায় দুঃখ থাকতে পারে অর্থমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আবুল বারকাত বলেন, আমার কিসের দুঃখ? দুঃখ থাকলে তার থাকতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় আমাকে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী করেন নাই। প্রধানমন্ত্রীর আদেশ-নির্দেশে যদি চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়, তাহলে অর্থমন্ত্রীর কাছে তদবির করা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বারকাত বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন জনতা ব্যাংকের স্বাস্থ্য খারাপ হয়েছে। স্বাস্থ্য খারাপ হলে আমার হয়েছে, ব্যাংকের হয়নি।
অধ্যাপক বারাকাত অভিযোগ করেন, একটি টিভি চ্যানেলের জন্য ৪০ কোটি টাকা ননফান্ড থেকে ফান্ড হিসেবে দেয়ার জন্য তিনি (অর্থমন্ত্রী) আমাকে তদবির (ফোন) করেন। আমি তার তদবিরের কারণে টাকা দিয়েছি। এর দায় অর্থমন্ত্রীকে নিতে হবে।
বারাকাত বলেন, তিনি মানুষকে হেয় করেন। মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে শেখেননি। তাই কথায় কথায় তিনি ‘রাবিশ’, ‘ফটকা’ এসব শব্দ ব্যবহার করেন। এতে তিনি সংবিধানের ৭(ক) ধারার লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধানে আছে, প্রজাতন্ত্রের মালিক হবে জনগণ। কিন্তু তিনি সেই জনগণকেই কথায় কথায় অপমান করছেন। কারণ প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোক হিসেবে তিনি এ ধরনের কথা বলতে পারেন না।
তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী দেশপ্রেমিক নন। মুক্তিযুদ্ধে তার অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। ১/১১ নিয়েও তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন রয়েছে। এ সময় তিনি কোথায় ছিলেন তা জানা দরকার। ওই সময় তিনি বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। শেখ হাসিনা জেলে ছিলেন। আর উনি পরিবেশ বন্ধু সেজে ছিলেন। আবুল বারাকাত বলেন, নৌকা বাইচের জন্য তিনি টাকা চেয়েছিলেন। দেইনি বলে তিনি আমার ওপর ক্ষুব্ধ।
বারাকাত বলেন, সিএসআর (করপোরেট স্যোশাল রেসপনসিবিলিটি) বন্ধ হলেও আমরা আইএসআর (ইনডিভিজুয়ালিটি স্যোশাল রেসপনসিবিলিটি) গঠন করি। যখন বানভাসি মানুষের হাহাকার, ঠিক তখন অর্থমন্ত্রী সিএসআর বন্ধ করলেন। তাই আমরা আইএসআরের মাধ্যমে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাঁদার মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ টাকা আদায় করে কুড়িগ্রাম ও জামালপুর এলাকায় সাহায্য করি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফার ১০ শতাংশ সিএসআরে ব্যয় হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মুনাফার ১০ শতাংশ সিএসআর আদায় করে এর ৫ শতাংশ আলাদা করে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করলে দুই বছরে তাদের দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তা করবেন না।
সরকারে প্রতি আবেদন জানিয়ে বারাকাত বলেন, অর্থমন্ত্রী কি বলছেন, আর আমি কি বলছি, তার সত্যতার জন্য একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করুন। তদন্তে যদি প্রমাণ হয় আমি দোষী, তাহলে আমি সব অভিযোগ মাথা পেতে নেব।
জনতা ব্যাংকের কাগজপত্র সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে আবুল বারাকাত বলেন, ২০১৩ সালে সব বাদ দিয়ে নিট লাভ ৯৫৫ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে দেশী-বিদেশী ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০০৮-১৩ সালে জনতা ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ১১৬ শতাংশ এবং মোট সম্পদ বেড়েছে ১১৯ শতাংশ।
পরিশেষে জনতা ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হেনস্থা না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থমন্ত্রী প্রতিহিংসা পরায়ণ। তিনি যদি আমার অবর্তমানে কোন কর্মকর্তাকে হেনস্থা করেন, তাহলে মাঠে নেমে আন্দোলনের হুমকি দেন।

সর্বশেষ সংবাদ